বরিশালের পোর্ট রোডে বহুদিন ধরেই অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার ছায়া চলে আসছিল। এবার সেই অন্ধকারেই যেন আরও হট্টগোল বাড়ল—আবিষ্কার হলো, আওয়ামী লীগ নেতা নিরব হোসেন টুটুল চারটি লাইসেন্সে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছেন। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের আভাস অনুযায়ী, ইতোমধ্যে টুটুলের লাইসেন্সে কলকাতায় গিয়েছে প্রায় দুই হাজার কেজি ইলিশ। এমন তথ্য শুনে বাজার-অবস্থা আর রাজনীতি দুইটাই উত্তাল।
টুটুল সম্পর্কে বরিশালে প্রচারিত কাহিনী তো নতুন কিছু নয়। সাদিক আবদুল্লাহর সময় বরিশালের দ্বিতীয় মেয়র হিসেবেই পরিচিত টুটুল ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক। সাদিক আবদুল্লাহর নিকটস্থ সহচরী হিসেবে তার ভূমিকা গুরুতর ছিল—নগর জীবনের হাট, বাজার, বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত কেমন করে নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা সমালোচকরা বারবার উচ্চারণ করে এসেছে। কুয়াকাটা সফরে পায়ে আঘাত লাগার পরও তিনি বরিশালের অনেক জায়গায় দাপট বজায় রেখেছেন, এক পায়ে চললেও টুটুলের প্রভাব কমেনি। আর আজ তার আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে মৎস্য ব্যবসাকেই চিহ্নিত করছেন অনেকে।
বিষয়টি আরও গরম হয়েছে কারণ সরকারি তালিকায় টুটুলের চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম আছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— মাহিমা এন্টারপ্রাইজ, তানিসা এন্টারপ্রাইজ, নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ এবং এআর এন্টারপ্রাইজ। মাহিমা ও তানিসা নামের দুইটি লাইসেন্স টুটুলের দুই মেয়ের নামে করা হয়েছে। বাকি দুটি লাইসেন্সে নাম রয়েছে তার ছোট মামা বাবর ও মামাতো ভাই আকাশের নামে। ২০১৯ সালে পূজার সময় থেকে শুরু হওয়া ইলিশ রপ্তানির প্রক্রিয়ায় টুটুল নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছেন বলে চলছে সমালোচনা।
সরকারি নিয়ম মেনে এ বছর একটি লাইসেন্সের বিপরীতে ২০ থেকে ৫০ টন পর্যন্ত ইলিশ রপ্তানি করার শর্ত থাকলেও, ৪টি লাইসেন্স হাতে নিয়ে টুটুলের মোট রফতানি ক্ষমতা প্রায় দুইশ টন পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে—যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য কোয়ারেন্টিন বিভাগের কর্মকর্তা আকসাদুল ইসলামও নিশ্চিত করেছেন, তানিসা এন্টারপ্রাইজ বৃহস্পতিবার ১ হাজার ৩৬০ কেজি ইলিশ পাঠিয়েছে ভারতে। আর সূত্র বলছে, শুরু হওয়া রপ্তানির মাত্র দুই দিনে ওই প্রতিষ্ঠান পাঠিয়েছে প্রায় দুই হাজার কেজি ইলিশ। তাতেই বোঝা যায়, কৌশল করে নেওয়া লাইসেন্সকে কার্যকর রপ্তানিতে পরিণত করা হয়েছে।
স্থানীয় আড়তদারদের অভিযোগও তুঙ্গে। তারা বলছেন, টুটুল নিতান্তই রপ্তানির পেছনেই বসে নেই—মোকামে যারা ব্যবসা করছে, তারা সকলে তার লোকজনের মাধ্যমে মাছ সংগ্রহ করছে। পোর্ট রোডের মোকাম এখনো টুটুলের ছায়ায় চলছে—আড়তদাররা বলেন, ৫ আগস্টের আগের মতোই মোড়ে এলসি সাইজের ইলিশগুলো টুটুলের লোকজনই ক্রয় করছে। এমনকি উঠে এসেছে অভিযোগ, টুটুলের পক্ষে কাজ করছেন বিএনপির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা, আর বিনিময়ে তাদের সু-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের বরিশাল মহানগর কমিটির সদস্য সচিব কামাল সিকদার এই মোকাম “সবাওলে আমার একা কাজের স্থান নয়” বলে বিবৃতি দিয়েছেন এবং বলেছেন, ইলিশ রপ্তানির অনুমতি সরকারি হওয়ায় সে আইনগত বাধা তিনি দিতে পারেন না।
তবে আড়ত-মহল আর সাধারণ মানুষের বক্তব্যের মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এক তত্ত্ব ঘুরছে—যদি স্থানীয় সরকার বা সংস্থাগত কর্তারা চাইলেই টুটুলের ব্যবসা বন্ধ করতে পারতেন, কেন তা হয়নি? সেখানে তিনটা প্রশ্ন উঠে আসে সুস্পষ্টভাবে—এক হলো লাইসেন্স কেন এমনভাবে আসে যে একই ব্যক্তির ঘনিষ্ঠজনের নামে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া হলো, দুই হলো ৫ আগস্টের পর টুটুল ভারতে পালিয়ে গেলেও কিভাবে রহস্যজনকভাবে মুক্তি পেয়ে আবার ব্যবসা চালাতে সক্ষম হলেন, তিন হলো স্থানীয় শক্তি-সংযুক্তরা কেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিল না। এসব প্রশ্ন এখনও অনায়াসে থেকে যাচ্ছে।
টুটুলের বিরুদ্ধে বরিশালে ইতিমধ্যেই ৭টি মামলা হয়ে গেছে বলে জানা যায়। ৫ আগস্টের পর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে ধরা পড়ে তিনি, পরে রহস্যজনকভাবে ছাড়া পেয়ে কলকাতায় চলে যান এবং সেখান থেকেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছেন—এসব বিষয়ের পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে বলে অনুসন্ধানে দেখা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকামের সভাপতি-সম্পাদক পদে যারা বসে আছেন, তারা জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের নেতা; তাদের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় টুটুলের ব্যবসা বন্ধ না করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কথা বলা হয়েছে কলকাতায় অবস্থানরত নিরব হোসেন টুটুলের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে, কিন্তু প্রতিউত্তর মেলেনি। বরিশালের পোর্ট রোড থেকে শুরু করে ইলিশ রফতানি শৃঙ্খলে যে আঁধার টানা পড়েছে, সেটি শুধুই একটি ব্যক্তির নয়—এখানে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক চক্র, ব্যবসায়িক ঘনিষ্ঠতা এবং সরকারি অনুমোদনের লঙ্ঘন। জনগণ এরইমধ্যে প্রশ্ন তুলছে—কতটা স্বচ্ছ এবং কতটা ন্যায্যভাবে দেশের সম্পদ নিয়ে এই ধরনের লেনদেন চলবে?
এ বেলায় মৎস্যসম্পদ রপ্তানি ও স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সরকারের জবাবদিহিতা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্নগুলো যতদিনই অজানা থাকবে, ততদিনই প্রহসনের মতো এই বাজার-রাজনীতি জনদুর্ভোগ বাড়াবে এবং বরিশালের নাম কোনোভাবেই পরিষ্কার থাকবে না।