রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর আওতাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ না করা, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, পিচের পুরুত্ব কম দেওয়া এবং যথাযথ তদারকি ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচের স্তর হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে আসছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
এলজিইডির প্রকল্প নথি অনুযায়ী, বাহেরচর বাজার থেকে নেতা বাজার নাদু প্যাদা বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৫১ কিলোমিটার সড়কের পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৭৮ লাখ ৬৫ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প অনুযায়ী এই সড়কে রাস্তার বেস প্রস্তুত, পাথরের খোয়া বিছানো, প্রাইম কোট, ট্যাক কোট, ২৫ মিলিমিটার পুরু মূল পিচ (কার্পেটিং) এবং এর উপর ১৫ মিলিমিটার সিল কোট দেওয়ার কথা রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২৫ মিলিমিটার কার্পেটিং কাজে প্রায় ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং ১৫ মিলিমিটার সিল কোট কাজে প্রায় ১৭ লাখ ৭ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাস্তবে কম পুরুত্ব, নিম্নমানের উপকরণ
তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক স্থানে নির্ধারিত পুরুত্ব অনুযায়ী পিচ দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও পাথরের খোয়ার মান অত্যন্ত নিম্নমানের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পিচ ঢালাইয়ের সময় পর্যাপ্ত বিটুমিন ব্যবহার না করায় রাস্তার উপরিভাগ শক্তভাবে বসেনি। ফলে নতুন নির্মিত রাস্তার বিভিন্ন অংশে হাত দিয়ে টান দিলেই পিচের স্তর উঠে যাচ্ছে।
সরেজমিনে পরিমাপ করে দেখা গেছে, যেখানে ১৫ মিলিমিটার সিল কোট থাকার কথা, সেখানে অনেক স্থানে মাত্র ১০ থেকে ১২ মিলিমিটার পুরুত্ব পাওয়া গেছে।
এছাড়া প্রকল্প অনুযায়ী রাস্তার দুই পাশে এজিং বা সাইড ড্রেসিং করার কথা থাকলেও এখনো অনেক স্থানে সেই কাজ সম্পন্ন হয়নি। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রাস্তার স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তদারকি ছাড়াই চলেছে পিচ ঢালাই
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ চলাকালীন সময়ে এলজিইডির কোনো প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নিয়মিত তদারকি করতে দেখা যায়নি।
বিশেষ করে পিচ ঢালাই ও সিল কোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর উপস্থিতি ছিল না বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
সড়কের অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করে সাংবাদিকরা বক্তব্য নিতে উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গেলে অফিস সহায়ক জানান, গত বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) বিকাল ৩টা থেকে উপজেলা প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট সড়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও) রাঙ্গাবালীতে উপস্থিত নেই।
তাদের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মৃধা বলেন,
রাস্তা করছে, পা দিয়া ছালাইলেও রাস্তা ওঠে যায়। বড় ভাড়ি গাড়ি আসলে দুই দিনও টিকবে না।
স্থানীয় আনছার ডাক্তার বলেন,
এই রাস্তায় গাড়ি চলে বেশি। আমরা ভালোভাবে কাজ করতে বললে তারা উল্টো রাগারাগি করে। আমরা কাজ বন্ধ করতে বলার পরও তারা রাতের আধারে কাজ করেছে।
স্থানীয় ফরহাদ হোসেন বলেন,
বৃষ্টি হইলেই রাস্তা ধুইয়া সরে যাবে। হাত দিয়া খোঁচা দিলে উঠে যায়, গাড়ির চাক্কায়ও উঠে যায়।
স্থানীয় খলিল মিয়া বলেন,
নাম মাত্র ঢালাই দিছে, পা দিয়া খোঁচা দিলে ঢালাই উঠে যায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএস জিয়াউল এন্ড ব্রাদার্স-এর কেয়ারটেকার আইয়ুব গাজী বলেন,
আমরা অর্ডার অনুযায়ী কাজ করছি। উপজেলা প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান স্যারের ভগ্নিপতির মৃত্যু হয়েছে, তাই তিনি অর্ডার দিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। এসও আরিফকে আসতে বলা হয়েছে। পুরান রাস্তা মিলাতে গিয়ে কোথাও কম-বেশি হইতে পারে। রোলারের চাপেও এই সমস্যা হইছে। হাতের কাজ সব জায়গায় এক হয় না।
বক্তব্য নিতে উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গিয়ে উপজেলা প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট কাজের এসও আরিফ হোসেন দুজনকেই অনুপস্থিত পাওয়া যায়।
অফিস সহায়ক জানান, উপজেলা প্রকৌশলী ভগ্নিপতির মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি চলে গেছেন।
এসও আরিফ হোসেনের বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি অফিসে আছেন কিনা তা নিশ্চিত নন, হয়তো সড়ক প্রকল্প এলাকায় তদারকি করতে গেছেন বলে ধারণা করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন,
আনীত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই সড়কে নিম্নমানের কাজ করা হলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে এবং জনগণের ভোগান্তি বাড়বে।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পের কাজ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।