নারী জাতি মানবসভ্যতার অর্ধেক, সৃষ্টির ধারক ও বাহক। নারী ছাড়া পৃথিবী যেমন অপূর্ণ, তেমনি নারী ছাড়া মানবজাতির অস্তিত্বও অসম্ভব।
অথচ এই নারীকেই আজ চারপাশে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়- সে কি নিরাপদ? রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি নিজ ঘরেও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে গভীর শঙ্কা।
যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, হত্যা- এই শব্দগুলো যেন প্রতিনিয়ত নারীদের জীবনের বাস্তবতা হয়ে উঠছে। নারীরা আজ ভয়ে কুঁকড়ে থাকেন, আত্মরক্ষার কৌশল শিখে চলেন, তবুও নেই স্বস্তি।
এই বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা কী ভাবছেন? কীভাবে দেখছেন এই সংকটকে? সেই ভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন সানজিদা খানম ঊর্মি।
“সম্মান, শিক্ষা ও শাস্তি- এই হোক নিরাপদ সমাজের মূলভিত্তি”
তানিয়া আহমেদ, প্রভাষক, ফার্মেসী বিভাগ।
আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক ভোরের, যেদিন আমার কন্যাশিশু রাস্তায় বেরিয়ে যাবে নিজের ইচ্ছায়, নিজের মতো করে, ভয় ছাড়াই। কিন্তু বাস্তবতা এমন যে, আজ নারীরা দিনের আলোতেও অনিরাপদ। আমরা ভুলে যাই- নারীও মানুষ।
তাকে মেয়ে, স্ত্রী বা মা হিসেবে নয়- মানবিক মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। এই পরিবর্তন আনতে হবে পারিবারিক পর্যায় থেকেই। শিশুদের শিখাতে হবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান এবং সহানুভূতি। আর অপরাধীদের জন্য থাকতে হবে ভয়াবহ শাস্তির দৃষ্টান্ত।
শুধু নারী দিবসে ফুল হাতে ছবি তুলে কিছু হবে না। আইনের কঠোর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সচেতনতা বাড়ানোই পারে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে। আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হলো- কার্যকর ও সাহসী সামাজিক পরিবর্তন।
“দশভুজা নারীর জন্য চাই নিরাপত্তার সীমানা”
তিথি হক, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ।
নারী মানেই মমতা, ধৈর্য, শ্রম আর ভালোবাসার আরেক নাম। ঘরের কাজ হোক কিংবা বাইরের দায়িত্ব নারী সমান দক্ষতায় সব সামলান। অথচ তাঁকেই আজ ভাবতে হয়, বাসা থেকে বের হলে কীভাবে নিজেকে সুরক্ষা করবেন। আমার ছাত্রীদের বলি, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কী ভাবো?
কেউ বলে ব্যাগে সেফটিপিন রাখি, কেউ পেপার স্প্রে। কেউ ইউটিউবে আত্মরক্ষার ভিডিও দেখে। সন্ধ্যার পরে বের হলে একা বের হই না। এই উত্তরগুলো আমার হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। কারণ এই ভয় নারীদের নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সচেতনতা গড়ে তোলা। স্কুলে গুড টাচ–ব্যাড টাচ শেখাতে হবে, আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে শুধু আইন বানালেই চলবে না-সেটির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আর আমরা সবাই পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান -আমাদের অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে শিখলে তবেই নারী নিরাপত্তার বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পারব।
“নারীর জন্য নিরাপদ দেশ গড়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার”
ফারজানা আক্তার, ১ম বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ।
বাংলাদেশ দিন দিন উন্নত হচ্ছে- শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো সবখানেই অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা এখনও ভীষণ পিছিয়ে। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন ধর্ষণ কিংবা নিপীড়নের খবর পড়ে আমরা স্তব্ধ হই, আতঙ্কিত হই, কিন্তু কতটুকু পরিবর্তন হয়?
একবার আমিও এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। সেই সময়টায় আমি ভেঙে পড়িনি, বরং শিখেছি কীভাবে নিজেকে সুরক্ষা দিতে হয়। আত্মরক্ষার প্রাথমিক কৌশল শিখেছি, আশপাশের নারীদেরও সচেতন করেছি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন সবসময় নারীকেই এসব ভাবতে হয়? কেন রাষ্ট্র, সমাজ বা প্রশাসন নারীর সুরক্ষায় সক্রিয় নয়? আমরা চাই আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগ হোক, পুলিশ-প্রশাসন ও আদালতে যেন নারী সম্মান পায়।
বিচার হোক জনসম্মুখে, দৃষ্টান্তমূলকভাবে। নারী যেন আতঙ্ক নয়, সাহস নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে, পথ চলতে পারে—সেই সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
“ভয় নয়, চাই কার্যকর বিচার ও নিরাপত্তা”
আফরা, ৩য় বর্ষ, আইন বিভাগ।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অপরাধীরা বারবার সুযোগ পায়, আর ভুক্তভোগীরা কাঁদে চোখের সামনে ন্যায়বিচার দেখা তাদের ভাগ্যে জোটে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে সবচেয়ে বেশি।
ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের পরও বহু ঘটনা চেপে যায়, নতুবা বিচার হতে হতে বছর কেটে যায়। অথচ নারীদের চলাফেরা, পোশাক, সামাজিক ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে বারবার। আমরা চাই এমন একটি সমাজ, যেখানে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ নয়, নিশ্চিত হবে।
অপরাধী শাস্তি পাবে। এটাই হবে স্বাভাবিক চিত্র। রাষ্ট্র যদি চায় নারীর অধিকার রক্ষা করতে, তবে আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে, দৃঢ়ভাবে বিচারের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। ভয়মুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের আইনের পাশাপাশি চাই শক্তিশালী সামাজিক সচেতনতা ও সমষ্টিগত উদ্যোগ।