আবু তাহের, জাককানইবি
বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবন যেমন সংগ্রামে ভরা, তেমনি ছিল সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে ত্রিশালের একটি নিরিবিলি জনপদের সঙ্গে।
ত্রিশালে অবস্থিত একটি প্রাচীন বটগাছ আজও বহন করছে সেই স্মৃতি। স্থানীয়দের কাছে ‘বটতলা’ নামে পরিচিত এই স্থানটি শুধু একটি গাছকে ঘিরে গড়ে ওঠা জায়গা নয়, বরং নজরুলের জীবনের এক বিশেষ সময়ের সাক্ষী।
আজ থেকে প্রায় ১১২ বছর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে আসেন কিশোর নজরুল। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে দারোগা রফিজউল্লাহ তাঁকে দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে (বর্তমান নজরুল একাডেমি) ভর্তি করান।
প্রথমে তিনি কাজীর শিমলা দারোগা বাড়িতে থাকতেন। পরে যাতায়াতের সুবিধার জন্য দারোগা রফিজউল্লাহ তাঁকে ত্রিশালের নামাপাড়ায় জায়গির হিসেবে রাখেন।
স্বাধীনচেতা স্বভাবের নজরুল মাঝে মাঝে স্কুল ফাঁকি দিয়ে একটি বটগাছে উঠে বসে বাঁশি বাজাতেন। যে বটগাছে বসে তিনি বাঁশি বাজাতেন, সেই গাছটিই এখন ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে পরিচিত। কবি আজ আর নেই, কিন্তু সেই বটগাছ এখনো তাঁর স্মৃতি বহন করে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সেই বটগাছের পাশেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কবির নামে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।’
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি এ নাজির নজরুল স্মৃতিবিজড়িত এই বটগাছের গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রথমবারের মতো এর চারপাশে পাকা বেদি নির্মাণ করেন। ত্রিশালের নজরুল স্মৃতিবিজড়িত অন্যান্য স্থাপনা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলেও এই বটগাছটি অনেকটাই অবহেলিত।
বটগাছসংলগ্ন চায়ের দোকান ও এর আশপাশের এলাকা এখন আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে, যা অনেকের কাছে বেমানান মনে হয়। স্থানীয়দের মতে, এতে কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
কাজী নজরুল ইসলাম ত্রিশাল ছেড়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। তবে ত্রিশালের মাটি, প্রকৃতি আর সেই বটগাছ আজও তাঁর স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
ত্রিশালের প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষের আন্তরিকতা ও শান্ত নিরিবিলি জীবন নজরুলের চিন্তা-ভাবনা ও সৃজনশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কখনো শুকনি বিলে বাঁশি বাজানো, আবার কখনো বটগাছের ছায়ায় বসে ভাবনায় ডুবে থাকা এসব অভিজ্ঞতা তাঁর কবিসত্তা গঠনে সহায়তা করেছে।
তাই ত্রিশাল শুধু একটি স্থান নয়, এটি নজরুলের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির সংরক্ষণ ও যথাযথ পরিচর্যা এখন সময়ের দাবি।