রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীরা আর কতদূর যাবে? বনানীর জাকারিয়া হোটেলে নারীদের ওপর বর্বর হামলার ঘটনায় বনানী থানা যুবদলের আহ্বায়ক মনির হোসেনকে বহিষ্কার করে দল নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করলেও—ঘটনার ভয়াবহতা এবং রাজনৈতিক গডফাদারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) রাতে যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মনির হোসেনকে দল থেকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় জড়িতদের দায় দল নেবে না এবং সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বহিষ্কৃত নেতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—শুধু বহিষ্কার করেই দায় এড়ানো যায় না। এমন ঘটনা ঘটা মানেই সংগঠনের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসী মানসিকতা’ লালন করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক নীতির ভয়ানক বিচ্যুতি।
অন্যদিকে, বনানী থানার ওসি মো. রাসেল সরোয়ার জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ একটি মামলা করেছে এবং পুলিশ ঘটনাটিকে ‘গুরুত্বসহকারে’ তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে তদন্ত কতদূর এগোয় বা আদৌ বিচার হয় কি না, সে নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, এ দেশে রাজনৈতিক পরিচয়ই অনেক সময় বিচারপ্রক্রিয়ার গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া ঘটনার চিত্র ছিল ভীষণভাবে পীড়াদায়ক। সেখানে দেখা যায়, আতঙ্কিত অবস্থায় কিছু নারী দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নামছেন, আর সেই সময় কিছু ব্যক্তিকে তাদের পথরোধ করতে ও শারীরিকভাবে বাধা দিতে দেখা যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তারা মাটিতে পড়ে যান এবং আশপাশে থাকা আরও কয়েকজন ব্যক্তি তাতে সক্রিয় অংশ নেন।
ঘটনার পুরোটা যেন রাজধানীর অভিজাত এলাকায় নয়, বরং শৃঙ্খলার অনুপস্থিত এক অন্ধকার পরিবেশে ঘটেছে—এমনটাই মনে করিয়ে দেয়। ভিডিওতে উপস্থিত কিছু লোকজনের আচরণ ছিল সংগঠিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়, বরং পূর্ব পরিকল্পনারও ইঙ্গিত দেয়।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পচন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?
এই ঘটনায় শুধু একক নেতা বহিষ্কারে সমাধান আসবে না। প্রশ্ন হলো—মনির হোসেন যদি অভিযুক্ত হন, তবে তার পেছনে কারা ছিল? দলীয় পদ পাওয়ার পেছনে যেসব রাজনৈতিক নেতা-মুরব্বিরা তার পরিচয়পত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা দায় এড়াতে পারেন কি?
রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আজ তারই ভয়াবহ প্রতিফলন ঘটেছে নারীদের ওপর চালানো এই হামলায়।
একদিকে দল বলছে, “আমরা দায় নেব না,” কিন্তু অন্যদিকে বছর পর বছর এইসব নেতাদের সংগঠনের নেতৃত্বে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে দায় কার?
এই ঘটনার বিচার কেবল আইনি নয়, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশেও জরুরি। নইলে সংগঠনের নামের আড়ালে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, তাদের হাতেই বারবার ধর্ষিত হবে রাজনীতি, আর পদদলিত হবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা।