সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত মানুষের জনপদে এখন বইছে সমৃদ্ধির বাতাস। লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পাথর শিল্প আজ কেবল একটি স্থানীয় ব্যবসা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির এক অপরিহার্য চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তবে এই অর্থনৈতিক জোয়ারের সমান্তরালে প্রকট হয়ে উঠছে পরিবেশ দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব।
১৯৮৮ সালে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে ত্রিদেশীয় বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করতে চালু হওয়া এই বন্দরটি বর্তমানে দেশের পাথর চাহিদার প্রায় ২৫% পূরণ করছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে প্রতি মাসে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০টি ট্রাকে করে ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকে কয়লা, পাথর ও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি হচ্ছে।
আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ইলিশ মাছ ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এই বন্দর দিয়ে রপ্তানি হচ্ছে। কাঁচা পাথর আমদানির পর তা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভেঙে ছোট টুকরো করে দেশজুড়ে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা কাঁচামালের চেয়ে ১০-১২ গুণ বেশি মুনাফা নিশ্চিত করছে। স্থানীয় জমির মালিকরা ইজারার মাধ্যমে কৃষি কাজের চেয়ে বর্তমানে প্রায় ১০ গুণ বেশি আয় করছেন।
বুড়িমারীতে বর্তমানে প্রায় ১,২০০টি পাথর ভাঙার মেশিন বা ক্রাশার মিল রয়েছে। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (প্রায় ৪০%) নারী শ্রমিক।
শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, এখানে প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ টাকার শ্রমবাজার পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে বঞ্চনার গল্প। হাতীবান্ধার শ্রমিক বশির মিয়া জানান, “এলাকায় অন্য কাজ নেই বলে দিনে ৪০০-৬০০ টাকা মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি।”
পাথর শিল্পকে কেন্দ্র করে বুড়িমারীতে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম হাজার হাজার ট্রাক চলাচলের কারণে পরিবহন ব্যবসা ও তেলের পাম্পগুলোর রমরমা ব্যবসা। প্রতিদিন ৩০ হাজার মানুষের আনাগোনায় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যাংকিং খাতে জোয়ার এসেছে। ঢাকার ব্যবসায়ী সারাফাত হোসেন বলেন, “সরকারি প্রণোদনা ছাড়াই আমরা এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছি। সঠিক সহযোগিতা পেলে এটি দেশের অন্যতম বড় শিল্প অঞ্চল হতে পারে।”
উন্নয়নের এই চাকচিক্যের নিচে চাপা পড়ছে কৃষি ও জনস্বাস্থ্য। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন মিয়ার মতে, প্রায় ৪০ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি এখন পাথর ভাঙার মেশিনের দখলে। পাথর ভাঙার মিহি ধুলো আর মেশিনের বিকট শব্দে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী এলাকা। শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা ফুসফুসের রোগ (সিলিকোসিস), শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শ্রমিকরা রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নিচে কোনো প্রকার মাস্ক বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এই শিল্পকে টেকসই করতে হলে অবিলম্বে অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শিল্পের উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি সমন্বিত টেকসই পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত উত্তরাঞ্চলকে দারিদ্রমুক্ত করতে বুড়িমারী স্থলবন্দর এক আশীর্বাদ। কিন্তু দূষণ রোধ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা না গেলে এই সম্ভাবনা অচিরেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। সঠিক নীতিমালা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বুড়িমারী হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির “নতুন ইঞ্জিন”।