আবু তাহের, জাককানইবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ছিল নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও দেশকে পুনর্গঠনের এক শুভ সূচনা। এর ভিত্তি রচিত হয় জুলাই মাসে ছাত্র সমাজের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এই নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা ছিল একটি বড় অংশ, যারা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করে সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশা ও দায়িত্ববোধের বার্তা দিয়েছেন। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, কাঙ্ক্ষিত সংস্কার, শিক্ষা ও অর্থনীতির দিকনির্দেশনা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ—এসব বিষয়ে নিজেদের আশা ও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ত্রয়োদশ সংসদ-পরবর্তী বাংলাদেশকে ঘিরে তাদের চিন্তা, ভাবনা ও স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন দেশকালের প্রতিনিধি আবু তাহের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুল্লাহ রিমন বলেন, ‘জুলাইয়ের এই বর্ষা বিপ্লব ও ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ার পর আমরা যে বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি, সেই জায়গা থেকে আমাদের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা—বাংলাদেশ যেন আর কখনোই ফ্যাসিবাদের কবলে নিমজ্জিত না হয়। বিশেষ করে এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে—বিজয়ী ও পরাজিত সকল দলের প্রতি একটি যৌথ দায়িত্ব রয়েছে,
যেন দেশে নতুন করে কোনো ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। সে ক্ষেত্রে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার তার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে যথাযথভাবে কাজ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর কাছেও আমাদের আশা,
তারা বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করবে। অতীতে আমরা দেখেছি, বিরোধী দলগুলো অনেক সময় নিজেদের একমাত্র দায়িত্ব হিসেবে সরকারবিরোধিতাকেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর আমরা মনে করি, বিরোধী দলের দায়িত্ব কেবল সবকিছুতে বিরোধিতা করা নয়; বরং রাষ্ট্র গঠনে সরকারের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা।
সরকার যদি কোনো ক্ষেত্রে ভুল করে, তা গঠনমূলকভাবে তুলে ধরা এবং সঠিকভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করাই হওয়া উচিত বিরোধী দলের ভূমিকা। এভাবে দায়িত্ব পালন করা গেলে আমরা আশা করি, বাংলাদেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠবে না।
সরকারি দলের প্রতিও আমাদের প্রত্যাশা—তারা এমনভাবে বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যাতে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ধ্বংসপ্রাপ্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠিত হয় এবং কার্যকরভাবে দাঁড়িয়ে যায়। বিশেষ করে যে জুলাই সনদ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় পেয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে সরকার সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে—এটাই জনগণের আশা।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাস পরিস্থিতির কথাও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই আন্দোলনের আগে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী কায়দায় যেভাবে ক্যাম্পাসগুলো দখলে রেখেছিল, তাতে শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য সকল সংগঠনের কার্যক্রম প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকারেও বারবার হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।
আমরা এই ধরনের ক্যাম্পাস, এই ধরনের বাংলাদেশ চাই না। আমরা এমন একটি ক্যাম্পাস চাই, যেখানে সকল শিক্ষার্থী তাদের নিজস্ব অধিকার ভোগ করতে পারবে। নতুন সরকারের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য মামুন সরকার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার চাওয়া থাকবে, আগামীর বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিক তার যথাযথ মর্যাদায় বসবাস করবে এবং ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবে। এখন নির্বাচন শেষ,
কিন্তু দায়িত্বের পথ এখনই শুরু। জয়-পরাজয়ের উচ্ছ্বাস পেরিয়ে আসুক আত্মসমালোচনা, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং জনকল্যাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে নয়; প্রতিদিনের জবাবদিহি, সহনশীলতা ও নাগরিক সচেতনতায়ই তা শক্তিশালী হয়। আসুন, বিভাজন নয়—পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের মাধ্যমে এগিয়ে নেই আমাদের দেশ।’
শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিন পর জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে, যা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২১২টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন জানিয়েছে।
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও রিজার্ভ দুর্বল হয়েছে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা—অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। শিক্ষাব্যবস্থায় বাস্তবমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যখাতে মানসম্মত চিকিৎসা এবং গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা একটাই—কথায় নয়, কাজে উন্নয়ন; পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন।’
সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী সৈতি মন্ডল বলেন,
‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কৃতির উপর যেই নগ্ন হামলা হয়েছে, সেটা যেন আর না হয়। আমি সংগীতের ছাত্রী। সংগীত একটি পরিবেশনা বিদ্যা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন সংগীতের আসর পন্ড করা হয়েছে,মাজারে হামলা হয়েছে, বাউলদের উপর হামলা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এক প্রকার বাধাগ্রস্ত ছিল। এরকম ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আমরা একটি মুক্ত স্বাধীন পরিবেশ চাই,যেখানে মুক্তভাবে কোনো বাধা ছাড়া সংস্কৃতি চর্চা করতে পারবো। শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে সংগীত, নাট্যকলা, চারুকলা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে যেন শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে, তাই কর্মক্ষেত্র বাড়াতে হবে।’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তার অমি বলেন, ‘নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। দেশে এসেছে নতুন সরকার ও নতুন প্রধানমন্ত্রী। এই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আমরা যে বাংলাদেশ চাই, তা হোক ন্যায়ের, মানবিকতার ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ।
আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ—যেখানে আইনের শাসন থাকবে সবার জন্য সমান,
যেখানে দুর্নীতির নয়, স্বচ্ছতার হবে শাসনের মূলনীতি, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ঘৃণার নয়, যেখানে উন্নয়ন হবে শুধু অবকাঠামোয় নয়, মানুষের জীবনমানেও।
নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ হোক কর্মসংস্থানের বাংলাদেশ—যুবকদের জন্য আশার, কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্যের, শ্রমিকের জন্য মর্যাদার, নারীর জন্য নিরাপত্তার বাংলাদেশ। আমরা চাই এমন একটি রাষ্ট্র,
যেখানে সরকার ও জনগণ মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি হাঁটবে; যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজন নয়; যেখানে রাজনীতি হবে সেবার মাধ্যম, ক্ষমতার নয়।এই প্রত্যাশা নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই—একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে।’
ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ঐশ্বর্য হৃদয় বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের কাছে আমাদের যেমন অনেক প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি আমার ব্যক্তিগত চাওয়াও রয়েছে। সর্বপ্রথম আমি চাই, এই সরকার যেন জননিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে হবে।
একই সঙ্গে বিচার বিভাগকে হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হলেই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আমি যেহেতু একজন শিক্ষার্থী, তাই শিক্ষাখাতে বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রত্যাশা করি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণদের গবেষণায় আগ্রহী করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে সরকার বড় অঙ্কের বাজেট ব্যয় করবে এবং সেই ব্যয় জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এই আশা রাখি। এছাড়া আমাদের চিকিৎসা খাত দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এই ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রত্যাশা জানাই সরকারের কাছে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতালগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমমানের হাসপাতাল নির্মাণ করে সেখানে দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমিকদের অধিকার। দেখা যায়, ন্যায্য মজুরির দাবিতেও শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। আমি চাই, এই গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে কোনো শ্রমিক যেন তার বেতন-ভাতার দাবিতে রাস্তায় নামতে বাধ্য না হয় এবং পুলিশ যেন লাঠিচার্জ বা গুলি না চালায়।
সরকারের কাছে অনুরোধ, একটি নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হোক, যাতে একজন শ্রমিক বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাপন করতে পারে।’