লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের সামরিক শাসক খলিফা হাফতারের বাহিনীকে পাকিস্তান অস্ত্র সরবরাহ করেছে। সৌদি আরবের অর্থায়নে এই অস্ত্র কেনাবেচার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন।
খলিফা হাফতারের বাহিনীর কাছে পাকিস্তানের অস্ত্র পৌঁছানোর বিষয়টি এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্চ মাসে বেনগাজি বিমানবন্দরে পাকিস্তান থেকে অন্তত পাঁচটি কার্গো বিমান অস্ত্র নিয়ে অবতরণ করেছে। দ্বিতীয় একজন কর্মকর্তা অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কী ধরনের অস্ত্র দেওয়া হয়েছে, তা জানাননি।
এর আগে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বেনগাজি সফরের পর হাফতারের পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি হয়েছে। এটি পাকিস্তানের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র চুক্তি।
কেন এই সহায়তা?
সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি আরব খলিফা হাফতারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। এর মাধ্যমে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের প্রভাবকে সরিয়ে নিজেদের জায়গা করে নিতে চায়। এই চুক্তির বিষয়ে অবগত লিবিয়ার একটি সূত্র জানায়, হাফতার পরিবার এখনও আমিরাতে প্রচুর সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক।
এক আরব কর্মকর্তা বলেন, “হাফতারকে আমিরাত থেকে দূরে সরিয়ে আনার জন্যই এই চুক্তি করা হয়েছে। সৌদি আরব ‘মধু’ ব্যবহারের নীতি নিয়েছে এবং বলছে, আমরা তোমাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারি।”
খলিফা হাফতার (৮২) এবং তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি ছেলে সাদ্দাম ফেব্রুয়ারির শুরুতে পাকিস্তানে বিরল এক সফরে গিয়ে সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, মার্চ মাসে যেসব অস্ত্রের চালান এসেছে, তার শর্তগুলো ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত হয়েছিল।
সুদান ও সামরিক সংহতি
অস্ত্র সরবরাহের পেছনে সৌদি আরবের একটি বড় লক্ষ্য রয়েছে। তারা চায় হাফতার যেন লিবিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর কাছে অস্ত্র পৌঁছানো বন্ধ করেন। লিবিয়া বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত, ত্রিপোলিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হামিদ দবেইবার সরকার এবং পূর্বাঞ্চলে হাফতারের সরকার।
সৌদি আরব হাফতারের বাহিনীকে ত্রিপোলি প্রশাসনের বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়াকেও সমর্থন জানাচ্ছে। এ দুটি বাহিনী মার্চ মাসে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘ফ্লিন্টলক’ মহড়ায় একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছে এবং একটি যৌথ সামরিক কমিটি গঠন করেছে। একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, সৌদি আরব নতুন অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে হাফতারের সহযোগিতা কিনছে।’
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ও পাকিস্তানের ভূমিকা
জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে আসিম মুনিরের বেনগাজি সফরের সময় পাকিস্তান হাফতারের লিবিয়ান আরব আর্মড ফোর্সেস (এলএএএফ)-কে অন্তত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েছিল। এই অস্ত্রগুলো চোখে দেখার সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। এতে ক্যামেরা ও ভাঁজ করা স্ক্রিন রয়েছে, যা অস্ত্রের সামনের অংশকে ৯০ ডিগ্রি কোণে ডানে বা বামে ঘোরানোর সুযোগ দেয়। ফলে ব্যবহারকারী যেকোনও কোণ থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারেন।
জাতিসংঘের প্যানেল জানিয়েছে, পাকিস্তান লিবিয়ায় জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেনি। কারণ তারা অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে করা প্রশ্নের কোনও জবাব দেয়নি। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাইরের দেশগুলো লিবিয়ায় অস্ত্র পাঠাচ্ছে।
সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের টানাপোড়েন
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। ইয়েমেন যুদ্ধ ও ২০১৯ সালে ত্রিপোলি দখলের অভিযানে তারা হাফতারকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু সুদানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সুদানের আধা-সামরিক বাহিনী আরএসএফ-কে সমর্থন দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নালিশ করেছিলেন। ডিসেম্বরে সৌদি আরব ইয়েমেনে আমিরাত সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালালে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
ইরান-মার্কিন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, রিয়াদ ও আবুধাবি তাদের বিভেদ ভুলে এক হবে। কিন্তু বাস্তবতায় তাদের মধ্যকার দূরত্ব বরং বেড়েছে। সৌদি আরব একদিকে মার্কিন অনুরোধে বিমানঘাঁটি ও আকাশপথের ব্যবহার বাড়াতে চাইছে, যুদ্ধের সমঝোতার জন্য তদবির করছে। অন্যদিকে আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনায় তারা হতাশা প্রকাশ করেছে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?