ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচিত হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বৃহস্পতিবার স্বদেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের মাটিতে পা রেখেই খোলা পায়ে মাতৃভূমির স্নিগ্ধ পরশ অনুভব করেন তিনি।
আবেগাপ্লুত হয়ে একমুঠো মাটিও হাতে তুলে নেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জনতার মহাসমুদ্রে উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হন সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর এই উত্তরসূরি।
ঢাকায় অবতরণের পরপরই তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। এরপর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রওনা হন পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ের গণসংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে।
সেখানে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন নিজের স্বপ্নের বাংলাদেশের রূপরেখা। দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন— “I have a plan.” সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সংবর্ধনা শেষে চিকিৎসাধীন মায়ের কাছে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তারেক রহমান।
জুলাই বিপ্লবের মুখে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পতন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র ভারতে পলায়নের পর থেকেই বাংলাদেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক উত্তরণের আলোচনা শুরু হয়। সেই সময় থেকেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন।
নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন। এর আগে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করে। সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট দিয়ে বের হয়ে জুতা-মোজা খুলে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন তারেক রহমান। এক আবেগঘন মুহূর্তে তিনি দেশের মাটি হাতে তুলে নেন। এরপর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা লাল-সবুজ বাসে চড়ে সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। পথে পথে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন।
সাধারণ সময়ে যেখানে ১৫–২৫ মিনিট লাগে, সেখানে লাখো মানুষের ভিড় ঠেলে সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছাতে তারেক রহমানের গাড়িবহরের সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত বাস থেকে নেমে হেঁটেই মঞ্চে ওঠেন তিনি। মঞ্চের তিনদিক ঘুরে জনসমুদ্রের অভিবাদন গ্রহণ করেন, মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বারবার জনগণের ত্যাগের মাধ্যমেই রক্ষা পেয়েছে—১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ইতিহাস তার সাক্ষী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে। পাহাড়-সমতল, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি নিরাপদ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
গত ১৫ বছরে গুম-খুন ও নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম জীবন উৎসর্গ করেছে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদিসহ সব শহীদের স্মরণ করে তিনি বলেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই হবে।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই, তাই ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামনে এগোতে হবে। গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং-এর বিখ্যাত উক্তি ‘I have a dream’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আজ তিনি বাংলাদেশের মানুষের সামনে বলছেন— “I have a plan for the people of my country.” এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা চান তিনি।
বক্তব্যের শেষভাগে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার ওপর জোর দিয়ে তিনবার উচ্চারণ করেন— “আমরা দেশে শান্তি চাই।” এরপর অসুস্থ মা খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
সংবর্ধনাস্থল ছাড়াও বিমানবন্দর ও পুরো ৩০০ ফিট এলাকা সকাল থেকেই জনসমুদ্রে রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও ভোটাধিকারহীনতার অবসান ঘটবে—এই প্রত্যাশা নিয়েই তারা উপস্থিত হয়েছেন।
২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় জোরপূর্বক নির্বাসনে পাঠানো এই নেতা দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, কারাবরণ ও প্রবাসজীবন পেরিয়ে আজ এক পরিপক্ব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে রূপ নিয়েছেন। দেড় যুগের নির্বাসন শেষে বীরের বেশে তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।