মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টায় ছিল উগ্রপন্থি একটি গ্রুপ। পরিকল্পনা ছিল বড় ধরনের অঘটনেরও। তবে গোয়েন্দা তৎপরতায় আপাতত তা ভেস্তে গেছে। অবশ্য তাতেও থেমে নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। বেশ কয়েকজনকে আইনের আওতায় নেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ধরে চলছে অভিযানও। পাশাপাশি দেশের সীমান্ত এলাকার কয়েকটি জেলায় ঝিমিয়ে পড়া নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠনের সদস্যরাও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে পাওয়া গেছে এই তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী একটি সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদকে গ্রেপ্তারের পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইসতিয়াককে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে তলে তলে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার তথ্য। এই গ্রুপটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র ও শাহবাগ চত্বরে জনসমাগমে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো নাশকতা চালাতে পারে বলেও তথ্য উঠে আসে। এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করা এবং এ জন্য তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগার লুটের মতো ভয়ংকর পরিকল্পনা করছিল বলেও জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে।
পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াককে গ্রেপ্তার করে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানার পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
অবশ্য গতকাল মঙ্গলবার কোস্টগার্ডের প্রতিষ্ঠাবাষির্কীর অনুষ্ঠান শেষে দেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি উত্থানের তথ্য এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি ওই শব্দকে (জঙ্গি উত্থান) রিকগনাইজ (স্বীকৃতি) করি না।
আমাদের দেশে এ রকম কোনো তৎপরতা নেই।
কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ (উগ্রপন্থি গোষ্ঠী) থাকে, পৃথিবীর সব দেশেই এ রকম অ্যাকটিভ (সক্রিয়) থাকে, র্যাডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে, এগুলোতে আমরা ইউজড টু, এগুলো থাকে।’
একটি বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো সদস্য কোনোভাবে দেশবিরোধী বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না, সেটা নিয়ে ইন্টারনাল ইন্টেলিজেন্স কাজ করে। সেটা সব বাহিনীতে থাকে এবং সমন্বিত একটা ফোর্সও থাকে এবং সেন্ট্রাল ভিজিলেন্স (কেন্দ্রীয় নজরদারি) থাকে। এগুলোর মধ্য দিয়ে কেউ যদি এ রকম কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাদের ফাইন্ড আউট (খুঁজে বের) করা হয় এবং তাদের জন্য যে আইনে যে সমস্ত প্রসিডিউর আছে, প্রসিডিং আছে সেগুলো ফলো করা হয়, ইট ইজ নাথিং নিউ (এটা নতুন কিছু নয়)।’
অবশ্য একই দিন সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে, এটা বলা যাবে না। এটা একটা সেনসিটিভ তথ্য। এ তথ্যটা গোপন থাকবে। কিন্তু যেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে—এটা ফ্যাক্ট; বাংলাদেশে জঙ্গি আছে।’
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি সমস্যাকে যে স্কেলে দেখানো হয়েছে, এটা ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিল। এটা অতিরঞ্জিত হয়েছিল ওই সরকারের সময়। পরবর্তীতে যে সরকারের সময় ইন্টেরিমের সময় এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই, এটাও আরেকটা এক্সট্রিম। এটাও ভুল কথা।
উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি-জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই।’
পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক সতর্কতার বিষয়ে তিনি বলেন, এই সতর্কতার মানে হচ্ছে, এটা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে, কারণ দেড় বছর ইন্টেরিম সরকারের সময় আমরা খেয়াল করেছি, এই প্রবণতার মানুষদের অনেক বেশি সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সেটারই খানিকটা ইমপ্যাক্ট আমরা বলতে পারি; এ সরকার এগুলো কমব্যাট করবে।
উগ্রবাদ প্রতিরোধে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ মূলত ‘দাওলাতুল ইসলাম’ নামের একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য। ইসতিয়াক আসল নাম হলেও সংগঠনে তার নাম আবু মোহাম্মদ। এই সংগঠনটির নাম সচরাচর শোনা না গেলেও ২০১৬ সালে ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার সময় ওই নামটি সামনে এসেছিল। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি উগ্রবাদী সংগঠনের আদর্শে উদ্ধৃত হয়ে দেশে নানা সময়ে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই আবু মোহাম্মদকে গ্রেপ্তারের পর আরও বেশকিছু তথ্য সামনে আসে। তার মাধ্যমে জানা যায়, একটি বাহিনীর চাকরিচ্যুত অন্তত দুই সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। তা ছাড়া অপর একটি বাহিনীর বিপথে যাওয়া আরও কয়েক সদস্যের তথ্য সামনে আসে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। এর পরই চট্টগ্রাম থেকে একটি মসজিদের ইমামকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি পুলিশের একজন কনস্টেবলকেও আলাদা রেখে তার কার্যক্রম নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তা ছাড়া সম্প্রতি ঢাকার অদূরে ধামরাই থেকে মো. রাকিব হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাহেদ নামে সিলেটের এক তরুণকেও খোঁজা হচ্ছে।
ওই সূত্রটি জানায়, উগ্রবাদী এই গ্রুপটি শুরুর দিকে সমকামীদের আড্ডায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিল। রাজধানীর শাহবাগে ‘সমকামীরা আড্ডা দেয়’—এমন তথ্য নিয়ে তারা সেই আড্ডাস্থলে আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। তাতে সফল হলে দেশের বড় বড় স্থাপনা তাদের টার্গেটে ছিল। এজন্য অস্ত্রাগার লুটের মতো পরিকল্পনাও ছিল। তবে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত কার্যক্রমের ফলে সব ধরনের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
উগ্রবাদ কার্যক্রম নজরদারি ও প্রতিরোধে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি নজরে আসা উগ্রবাদী গ্রুপগুলোর মধ্যে দাওলাতুল ইসলাম ছাড়াও তেহেরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির ভাবাদর্শের লোকজন থাকতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দারা নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে।
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব-২-এর অধিনায়ক খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, ‘এরকম কোনো আশঙ্কা বা হুমকি এই মুহূর্তে আমরা দেখছি না। আমরা প্রত্যাশা করছি, অপরাধীরা এ ধরনের সাহস অন্তত করবে না। আমাদের সেই নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় ডিপ্লয়মেন্ট রয়েছে।’
র্যাব-২-এর অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা যে কোনো হুমকি, যে কোনো ঝুঁকি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আমাদের যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি অফিস এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভবন-স্থাপনা আছে, সবগুলোতে নিরাপত্তা দিতে আমাদের টহল, গোয়েন্দা নজরদারি চলমান আছে। পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিয়োজিত রয়েছে।’
ধামরাই থেকে উগ্রবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার সেই রাকিব কারাগারে: এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সর্তকবার্তার পর গত শনিবার ঢাকার অদূরে ধামরাই থেকে রাকিব হোসেন নামে ২০ বছর বয়সী সন্দেহভাজন এক উগ্রবাদী তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান গতকাল কালবেলাকে বলেন, রাকিব নামে ওই আসামিকে পুলিশ সদর দপ্তরের স্মারকমূলে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুরো ঘটনাটি ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা তদন্ত করছেন।
ধামরাই থানা পুলিশ রাকিবকে কারাগারে পাঠিয়ে আদালতকে জানিয়েছে, গ্রেপ্তার রাকিব নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনের সমর্থক। সে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে। গ্রেপ্তার রাকিব ফেসবুকের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সংগঠনে তার নাম উবাইদা আল ওসামা। পলাতক মাহেদের সঙ্গেও তার অনলাইন যোগাযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, গোয়েন্দা তৎপরতার ভিত্তিতে আপাতত এই উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা ঠেকানো গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বসে নেই। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গ্রুপের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সূত্রগুলো বলছে, নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনের অপতৎপরতার চেষ্টার মধ্যে দেশের কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় ঝিমিয়ে পড়া নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠনের সদস্যরাও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। মূলত সরকারকে বিব্রত করতে বিভিন্ন সময় আত্মসমর্পণ করে সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসা চরমপন্থি সদস্যদের সংঘটিত করছে বলে তথ্য রয়েছে। এদের পেছনে দেশকে অস্থিতিশীল করতে জড়িত তৃতীয় কোনো পক্ষ রয়েছে বলে সন্দেহ হচ্ছে। পুরো বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রয়েছে।