মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আবারও উত্তেজনা চরমে উঠেছে, আর এই উত্তেজনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। দেশটির সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব কল্পনাপ্রসূত পোস্ট দিচ্ছেন, সেগুলো দিয়ে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ কোনোভাবেই পরিচালিত হবে না। তার এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সরাসরি একটি কঠোর বার্তা, যেখানে ইরান তাদের সার্বভৌম অবস্থান এবং সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো ধরনের আপসের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
পার্সটুডে’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সংসদীয় কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির জবাবে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, হুঁশিয়ার! হরমুজ প্রণালীর নতুন সামুদ্রিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপ সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইরান কার্যত জানিয়ে দিল, তারা শুধু রাজনৈতিক ভাষণে সীমাবদ্ধ থাকবে না, প্রয়োজনে সামরিক অবস্থানও নিতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগর ট্রাম্পের কল্পনাপ্রসূত পোস্ট দিয়ে পরিচালিত হবে না! কেউই দোষ চাপানোর এসব নাটক ও কৌশল বিশ্বাস করে না। এই মন্তব্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে উসকে দিয়ে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে, আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এমন বক্তব্য সামনে আনা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী নিয়ে যে নতুন বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি দাবি করেছেন, প্রণালীকে জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এমনকি তিনি এটাও বলেছেন, এসব কার্যক্রম সোমবার সকাল থেকেই শুরু হবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত আন্তর্জাতিক জলপথে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ইরানের কাছে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে একাধিকবার এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে উঠেছে, এমনকি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরোনো দ্বন্দ্বকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে একপক্ষ সরাসরি হস্তক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছে, আর অন্যপক্ষ তা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঠোর প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই বাইরের শক্তির আধিপত্য মেনে নেবে না, বিশেষ করে এমন একটি কৌশলগত জলপথে যেখানে তাদের ভৌগোলিক ও সামরিক উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না, বরং আরও সক্রিয় হওয়ার কথাই বলছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী আবারও হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতির বিস্ফোরণমুখী এক কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপই বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই কূটনৈতিক উত্তেজনা কথার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তব কোনো সংঘাতে রূপ নেয়, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো বিশ্বে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?