ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এবার রাশিয়া সফরে গেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি ইতিমধ্যে সেইন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের সরকারি সংবাদসংস্থা ইরনা।
আরাগচিকে বহনকারী বিমানের কলসাইন রাখা হয়েছে ‘মিনাব ১৬৮’। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত শতাধিক শিশুর স্মৃতির উদ্দেশে এই নাম রাখা হয়েছে।
একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, পাকিস্তানে সংক্ষিপ্ত সফরের পরেই রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ছিল আরাগচির। মস্কো সফরে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের বরাতে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এই সফরে ‘আলোচনার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি ও আনুষঙ্গিক নানা বিষয় নিয়ে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন’ আরাগচি।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে মস্কোতে নিযুক্ত তেহরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে আরাগচির বৈঠকে মূলত ‘আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি ও যৌথ কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার’ ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রদূত জালালি আরও বলেন, ‘স্বাধীন ও ন্যায়বিচারকামী দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বগ্রাসী শক্তিগুলোর যে ক্যাম্পেইন চলছে, তার বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ জোটের প্রতিনিধি ইরান ও রাশিয়া।’
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ফের আলোচনার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে আশাবাদী মধ্যস্থতাকারীরা। এর মাঝেই ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইসলামাবাদ থেকে মস্কোতে গেলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফরের ফাঁকে ওমানে গিয়েছিলেন আব্বাস আরাগচি।
অবশ্য ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সরাসরি ফের আলোচনা শুরু হওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনও পর্যন্ত মেলেনি।
তবে পরোক্ষ তৎপরতা যে অব্যাহত রয়েছে, তার আভাস মিলেছে ইরানি সংবাদসংস্থা ফারস-এর প্রতিবেদনে। তারা জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘লিখিত বার্তা’ পাঠিয়েছে ইরান। ওই বার্তায় ‘পরমাণু ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি-সহ ইরানের কয়েকটি শর্ত ও সীমারেখা’র কথা স্পষ্ট করা হয়েছে।
যদিও ফারসের দাবি, এই বার্তা কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার অংশ নয়।
গত ৭ এপ্রিল তেহরান ও ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য সেই চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে যে সঙ্ঘাত শুরু হয়েছিল, এই যুদ্ধবিরতির ফলে তা আপাতত অনেকটাই স্তিমিত রয়েছে।
কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পথ এখনও অধরাই রয়ে গেছে। পাশাপাশি যুদ্ধের জেরে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ধাক্কাও বিশ্বজুড়ে অব্যাহত আছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, হু হু করে বাড়ছে দাম। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করেছে আমেরিকা।
শনিবার নতুন করে একদফা আলোচনার আশা তৈরি হয়েছিল। আমেরিকার দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কাশনারের ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প পরে ফক্স নিউজকে বলেন, তিনি ওই সফর বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, ‘বসে বসে কথা বলে অহেতুক সময় নষ্ট’ করার কোনো যুক্তি নেই।
রোববার একই সংবাদমাধ্যমকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলেছি, আমরা আর এটা করছি না। তুরুপের সব তাস আমাদের হাতে। ওরা যদি কথা বলতে চায়, তবে আমাদের কাছে আসতে পারে। অথবা আমাদের ফোন করতে পারে। টেলিফোন তো আছেই। আমাদের সংযোগ ব্যবস্থাও বেশ সুরক্ষিত।’
সফর বাতিলের অর্থ ফের সম্মুখ সমরে ফিরে যাওয়া কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘না, এর অর্থ আদৌ তা নয়।’
‘শাটল’ কূটনীতি
শনিবার মাস্কাট যাওয়ার আগে আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী আসিম মুনির, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করেন। রোববার ফের ইসলামাবাদে ফিরে আসেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাশিয়ায় গিয়ে দেশটির ‘সিনিয়র কর্মকর্তাদের’ সঙ্গে কথা বলবেন আরাগচি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার মস্কো সফরের কথা নিশ্চিত করেছে।
দফায় দফায় এসব বৈঠকের মাঝেই ওয়াশিংটনের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আরাগচি। তিনি বলেন, ‘কূটনীতির বিষয়ে আমেরিকা আদৌ কতটা আন্তরিক, তা এখনও দেখার অপেক্ষায় রয়েছি।’
আরাগচির এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি। সমাজমাধ্যমে করা এক পোস্টে আরাগচি বলেন, হরমুজে তাদের উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ দুই-ই রয়েছে।
গত কয়েক দশক ধরেই ইরানের অন্যতম কৌশলগত মিত্র রাশিয়া। সেই সুবাদে মস্কোর কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে চাইছে তেহরান। সোমবারই আরাগচির রাশিয়া পৌঁছনোর কথা। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?