আবু তাহের, জাককানইবি
শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন : মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে প্রতিবছর নতুন করে গুরুত্ব পায় দিনটি।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। এ উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী ভাবনা ও প্রত্যাশা। বিশেষ করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিয়ে তারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন।
শিক্ষার্থীদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। তবে বাস্তবতায় রাজনৈতিক চাপ, বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব এবং সরকারঘনিষ্ঠ এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা তার নিরপেক্ষতা হারায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষার্থী ঐশী পোদ্দার আরোহী বলেন, ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এমন গণমাধ্যম চাই, যা সত্য প্রকাশে সাহসী, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় এবং মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক হবে। গণমাধ্যম এমন একটি শক্তি, যা সমাজকে সচেতন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরে। তাই আমি চাই সংবাদমাধ্যম সব ধরনের চাপ, ভয় ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে বস্তুনিষ্ঠ ও যাচাইকৃত সংবাদ প্রকাশ করুক।
আমি চাই গণমাধ্যমে তরুণ সমাজের কণ্ঠস্বর আরও জোরালোভাবে উঠে আসুক। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাফল্য, শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা, কর্মসংস্থানের সংকট, মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি করে আলোচনা হোক।
কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে, আর তাদের ভাবনা তুলে ধরা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হবে না বরং এটি হবে সত্য, সচেতনতা ও পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক। যে গণমাধ্যম সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নেবে, মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে এবং একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।’
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সুজানা ইতি বলেন, ‘বিপ্লবোত্তর সংবাদপত্রের নবদিগন্ত: স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার সন্ধানে ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের ভয়ের সংস্কৃতি ও ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ এর শৃঙ্খল ভেঙে সাংবাদিকতা আজ যেন মুক্ত বাতাসের স্বাদ পেয়েছে।
বর্তমানে গণমাধ্যমে যে বাকস্বাধীনতা ও সমালোচনা করার অকুতোভয় সাহস আমরা দেখছি, তা একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। তবে এই স্বাধীনতার পিঠে চড়ে আসা ছদ্মবেশী ‘গুজব’ এবং তথ্যের বিকৃতি সমাজকে বিভ্রান্তির কানাগলিতে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
বিগত সময়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা কেবল সরকারদলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যা পেশাদারিত্বের চরম অবক্ষয়। বর্তমানে সেই পক্ষপাতদুষ্ট ধারা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ মিললেও, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
প্রকৃতপক্ষে, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ঢাল হবে না, বরং তা হবে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বচ্ছ দর্পণ। ভবিষ্যতের কাম্য গণমাধ্যম হবে এমন এক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সংবাদ প্রকাশের অদম্য সাহসের সাথে মিশে থাকবে বস্তুনিষ্ঠার গভীর দায়বদ্ধতা। তথ্য যাচাইয়ের কঠোর মানদণ্ড বজায় রেখে সাংবাদিকরা যখন কেবল সত্যের প্রতি অনুগত থাকবেন, তখনই মানবাধিকার ও নিরাপত্তা সুসংহত হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গঠিত হবে।’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জায়েদ আহাম্মদ বলেন, ‘আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, এই দিনটি শুধু উদ্যাপনের নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের দর্পণ যেখানে সত্য, ন্যায় ও জনগণের কণ্ঠ প্রতিফলিত হওয়া উচিত। তাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশন আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে।
বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। আমরা এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যা কোনো ধরনের সরকারি বা ক্ষমতাসীন মহলের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে সত্য প্রকাশে সাহসী ভূমিকা রাখবে।
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের মানুষ যে নতুন প্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে, তার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্ত ও নির্ভীক গণমাধ্যমের আকাঙ্ক্ষা। জনগণ এখন এমন সংবাদ চায়, যা তাদের বাস্তবতা তুলে ধরে, বিভ্রান্তি নয় বরং সচেতনতা সৃষ্টি করে।
দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সময়ে কুতথ্য, অপতথ্য ও যাচাইবিহীন সংবাদের প্রবণতা বেড়েছে, যা সমাজে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করছে। তাই গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রকাশ না করা এবং নৈতিকতার মানদণ্ড অটুট রাখা।
স্বাধীন বাংলাদেশে এবং প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বে মুক্ত গণমাধ্যম শুধু প্রয়োজনই নয়, বরং একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে আমরা এমন একটি গণমাধ্যম প্রত্যাশা করি, যা সত্যের পক্ষে, জনগণের পক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবে।’
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যা সত্যকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরবে, কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা গোষ্ঠীগত চাপের কাছে মাথা নত করবে না। যেখানে সাংবাদিকতা হবে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে, কেবলমাত্র চটকদার খবরের জন্য নয়।
আমি চাই, গণমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বর হোক-বিশেষ করে প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কথা তুলে ধরুক। সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে তা হবে দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর। ভুয়া খবর, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত একটি স্বচ্ছ মাধ্যম চাই।
গণমাধ্যম যেন ক্ষমতার মুখপাত্র না হয়ে, ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। সাংবাদিকরা যেন নিরাপদে কাজ করতে পারেন, ভয় বা হুমকির মধ্যে নয়। আমি এমন মিডিয়া চাই, যা মানুষকে সচেতন করবে, বিভক্ত নয়-ঐক্যবদ্ধ করবে।
যেখানে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও মানবকল্যাণমুখী গণমাধ্যমই আমার প্রত্যাশা।’