মজনুর রহমান আকাশ, মেহেরপুরঃ
মেহেরপুরে বোরো মৌসুমে সরকারি খাদ্য গুদামে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত মিলমালিকের পরিবর্তে প্রভাবশালী মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা অধিকাংশ চাল সরবরাহ করছেন। এই সুযোগে খাদ্য কর্মকর্তা ও মিল মালিকেরা মিলে ভাঙ্গা ও নিম্নমানের চাল ক্রয় করে সংগ্রহ অভিযান শেষ করে।
অধিদপ্তর বলছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ কর্মসূচি গত ১৫ আগস্ট শেষ হয়েছে। এবার ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪২ মেট্রিক টন ধান (১০৭.৬৯%), ১৪ লাখ ৬ হাজার ৫৩৩ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল (১০০.৪৬%) এবং ৫১ হাজার ৩০৭ মেট্রিক টন আতপ চাল (১০২.২১%) সংগৃহীত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
গত ৯ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে সাড়ে তিন লাখ টন ধান, ১৪ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৩৫ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে সংগ্রহ মূল্য ধান প্রতি কেজি ৩৬ টাকা, চাল প্রতি কেজি ৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত ১৪ এপ্রিল থেকে বোরো সংগ্রহ শুরু হয়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মতে, গত বোরো মৌসুমে মেহেরপুরে ৪৯ টাকা দরে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়। সদর উপজেলায় ৮জন মিল মালিকেরা কাছ থেকে ৬০৮ মেট্রিকটন, গাংনী উপজেলায় ৫জন মিল মালিকের কাছ থেকে ৩৮৮ মেট্রিকটন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সদর খাদ্য গুদামের সরবারহকৃত ৬০৮ মেট্রিকটন সিদ্ধ চালের বেশিরভাগ ভাঙ্গা, বাদামি রং এর চাল। স্থানীয়রা যে চালকে চালের খুদ বলে। হাসঁ মুরগিকে চালের খুদ খেতে দেওয়া হয়। ৫০ কেজির বেশিরভাগ পাটের বস্তায় নিম্নমানের চাল পাওয়া গেছে।
সদর উপজেলার বড় বাজার এলাকায় খাদ্য গুদামের অবস্থান। গত রোববার সকাল ৯টায় গুদামে গিয়ে দেখা যায় গুদামের প্রতিটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) বন্ধ রয়েছে। চলতি মাসে খাদ্য পরিদর্শক হিসাবে যোগদান করেছে সোহেল রানা।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, বোরো মৌসুমের চাল সংগ্রহের সময় এখানে দায়িত্বে ছিলেন দেবদুত রায়। ভাঙ্গা অথবা নিম্নমানের চাল সংগ্রহের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।
মুঠোফোনে সদর উপজেলার সাবেক খাদ্য পরিদর্শক দেবদুত রায় বলেন, নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে ধান সংগ্রহ করে মিল মালিকেরা চাউল তৈরি করবেন। এবং সেই চাল পরিস্কার করে গোদামে সরবারহ করবেন।
তবে মেহেরপুরে হাসকিঙ্ক মিলগুলোর চাউলের মান ভালো না হওয়ার কারণে মিলমালিকেরা আশে পাশের জেলার অটোরাইচ মিল থেকে চাল নিয়ে খাদ্য গোদামে সরবারহ করেন। প্রতি বস্তা চাল তো আর দেখে নেওয়া যায়না।
গাংনীর বামন্দী এলাকার কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, “আমরা ধান বিক্রি করতে গেলে কেউ নেয় না। পরে দেখি ওই ধানই চাল হয়ে সরকারি গুদামে ঢুকছে মিল মালিকদের নামে।
” স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, “সরকার কৃষকের স্বার্থে সংগ্রহ অভিযান চালালেও বাস্তবে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন। অনিয়ম বন্ধ না হলে এর পুরো সুফল মিল মালিকদের হাতেই চলে যাবে।”
নিয়ম অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে তা চুক্তিবদ্ধ মিলারদের মাধ্যমে চাল বানিয়ে সংগ্রহ করার কথা। কিন্তু অভিযোগ আছে, কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ধান না কিনেই সরাসরি নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে ধান ছাঁটাই, পরিবহন ব্যয়সহ ভালো চালের খরচ দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
গাংনী খাদ্য পরিদর্শক ওসি এলএসডি মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, গাংনী উপজেলায় মোট ৩৮৮ মেট্রিকটন সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। ভাঙ্গা চাল হলেও এই চাল খাওয়া যাবে। টিআর, কাবিখা, ওএমএস কার্যক্রমে বোরো মৌসুমের চাল বিতরণ শুরু হয়েছে।
সূত্রমতে, এবার বোরো মৌসুমে গাংনী উপজেলায় খাদ্যগুদামে ৫ মিল মালিকের সঙ্গে চুক্তি হয়। মিলগুলো হলো, মেসার্স রাজ্জাক রাইচ মিল, দেলবার রাইচ মিল, সজিবুর রাইচ মিল, শহিদুল হক রাইচ মিল, খলিলুর রাইচ মিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মিল মালিক জানান, “কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে চাল সরবরাহ করা হয়। তারা মান যাচাইয়ে চোখ বন্ধ রাখেন।” উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক কেজি প্রতি কখনো ১ টাকা আবার কথনো ২ টাকা করে নেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এসব মিলে ধান থেকে চাউল তৈরি করা হয়না। তিনজন মিল মালিক জানেই না যে তাদের লাইসেন্সে সরকারি গুদামে চাল সরবারহ করা হয়েছে। জানতে চাইলে খলিলুর রাইচ মিলের মালিক খলিলুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন,
উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মিলে প্রকৃত মিল মালিকদের নামে চাল সরবারহ করে। এসব চাউল আসে কুষ্টিয়া কুমারখালির খাজা নগরে অবস্থিত অটো রাইচ মিল থেকে। সেখানে ভালো চালের সঙ্গে ভাঙ্গা চাল মিশ্রণ করা হয়।
গাংনী উপজেলার মড়কা বাজারের মেসার্স সজিবুর রাইচমিলের চালকলে গিয়ে দেখা যায়, কোনো কাজকর্ম নেই। একজন কর্মচারী বসে আছেন। তিনি বললেন, এই মিলে আর তেমন কোন কাজ হয়না। গ্রামের কৃষকেরা নিজেদের বাড়ির জন্য ধান পিশায় করে চাল করিয়ে নেই। আর গম পিশায় করা হয়।
মালিক সজিবুর রহমান ছিলেন না। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আপনি সাংবাদিক আপনি জানেন না? কিভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতারা খাদ্য গুদামে চাল সরবারহ করে।
গত চার বছর থেকে আমার মিল থেকে ১ কেজি চালও দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমি কোন চাল সরবারহ করিনি। তাহলে কি করে আমারা লাইসেন্সে চাল গোদামে গেলো?
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আসমা বেগম বলেন, অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাচঁ সদস্য বিষিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা গোদামে মজুদ চাউলের পরিক্ষা নিরিক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দেবে। এর পর বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।