বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের চিন্তা করছেন—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দেশব্যাপী চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইউনূসের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক শেষে নাহিদ ইসলাম জানান, প্রধান উপদেষ্টা নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছেন—যেভাবে তাকে ঘিরে আন্দোলন, চাপ এবং রাজনীতিকরণ চলছে, তাতে তিনি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী,
“একটি গণঅভ্যুত্থানের পর আপনারা আমাকে একটি ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এনেছেন, কিন্তু এখন যদি সেই ঐক্য না থাকে, আমি কীভাবে কাজ করব?”
নাহিদ বলেন, ইউনূসের ভাষায়, বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো যদি একটি সমন্বিত অবস্থানে না আসে, তাহলে তার পক্ষে সংস্কার কিংবা নির্বাচন বাস্তবায়ন কার্যকরভাবে করা সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, ইউনূস আভাস দিয়েছেন, যদি রাজনৈতিক আস্থা এবং সমর্থনের পরিবেশ না থাকে, তবে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করবেন।
এই ঘটনাপ্রবাহ এমন এক সময় ঘটছে, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে তিন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করা হয়—তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। এর পেছনে কারণ হিসেবে বিএনপি বলছে, এসব উপদেষ্টার পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকাই চলমান অচলাবস্থার অন্যতম উৎস।
বিএনপির সমর্থনে রাজপথে থাকা কর্মীরা ইতোমধ্যেই ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে শপথ না পড়ানোর প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের হাইকোর্টের রায়ে রিট খারিজ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। আদালতের রায় অনুযায়ী, এখন ইশরাক হোসেনকে শপথ নিতে কোনো আইনি বাধা নেই।
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির একটি অংশও ইউনূস সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে তারা একাধিক উপদেষ্টাকে বিএনপির ‘মুখপাত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন—আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ।
তবে এই টালমাটাল অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক পোস্টে পূর্বের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও শব্দচয়নের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। এটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ সমঝোতার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন।
দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—অধ্যাপক ইউনূস কি পদত্যাগ করবেন? যদি করেন, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কাঠামোর ভবিষ্যৎ কী হবে? আর যদি না করেন, তবে কীভাবে তিনি এই রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সব পক্ষকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য রোডম্যাপ দিতে সক্ষম হবেন? সময়ের উত্তরই এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি দেবে।
বিবিসি