সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাট জেলার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে মৃত খাল পুনঃখনন ও সংস্কারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ‘অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)’ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলার পাঁচটি উপজেলাতেই এই কার্যক্রম এখন দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি লালমনিরহাটের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
৪ মে (সোমবার) পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলার হোসনাবাদ (জিয়া খাল) বড়ঝার মসজিদের সামনে থেকে সরওয়ার্দী বাড়ির খুটামারা নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করেছেন লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান।
হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খুটামারা খালটি খনন করেছিলেন, যা স্থানীয়দের কাছে ‘জিয়া খাল’ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া এই খালটি এখন পুনঃখনন করা হচ্ছে।
প্রকল্পের একনজরে পরিসংখ্যান ১.৯৫ কিলোমিটার লম্বা এবং পাড়সহ ১৪.৯০ মিটার চওড়া। মোট ব্যয় প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। ৪৩ দিনের এই প্রকল্পে ৫১৬ জন উপকারভোগী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, যাদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা।
লালমনিরহাটের প্রতিটি উপজেলায় এখন মৃত খালগুলো সচল করার কাজ চলছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে চলমান প্রধান প্রকল্পগুলো হলো লালমনিরহাট সদর কুলাঘাট ইউনিয়নের বড়ুয়া খাল পুনঃখনন কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এতে সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দূর হবে। কালীগঞ্জ দলগ্রাম ইউনিয়নের বলাইয়েরপাট খাল খনন করা হচ্ছে। এর ফলে বোরো মৌসুমে সেচ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করছেন কৃষকরা। আদিতমারী এই উপজেলার রত্নাই খাল খনন প্রকল্পের প্রায় ৮৫% কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কাজের গুণগত মান বজায় রাখতে বর্তমানে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। হাতীবান্ধা সিঙ্গীমারীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে মৃত খাল ও জলাশয় সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার উদ্বোধন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাবে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সরকার আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, লালমনিরহাট জেলা তার অন্যতম সফল অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এই উদ্যোগের বহুমুখী সুফলগুলো হলো কৃষি বিপ্লব মৃত খাল সচল হওয়ায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়বে, যা বোরো চাষে সেচ খরচ কমিয়ে দেবে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন সহজ হবে, ফলে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। খালের গভীরতা বাড়ায় স্থানীয়রা সেখানে মাছ চাষ করতে পারবেন। এছাড়া খালের দুই পাড়ে ফলজ ও বনজ গাছ লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখা হচ্ছে। ইজিপিপি প্রকল্পের আওতায় হাজার হাজার অতিদরিদ্র মানুষের তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান বলেন, “আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। কৃষকের উন্নয়ন ও অধিক ফসল ফলানোর চিন্তা থেকেই এই খাল খনন কর্মসূচি। এটি কেবল পানি সরবরাহই নিশ্চিত করবে না, বরং এখানে মৎস্য চাষ ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি স্বাবলম্বী হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পাটগ্রাম উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা দেব জন মিত্র, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব সফিকার রহমান, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিউর রহমান সোহেল এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আতাউর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অতীতের যেকোনো অনিয়ম রুখতে বর্তমানে প্রতিটি প্রকল্পের কাজের মান কঠোরভাবে মনিটরিং করছে স্থানীয় প্রশাসন। লালমনিরহাটের এই খাল খনন কর্মসূচি সফল হলে জেলার কয়েক লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং কৃষি উৎপাদনে জেলাটি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।