নেত্রকোনা প্রতিনিধি :
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সময়ের সাথে সাথে হাওরাঞ্চল নেত্রকোনায় বজ্রপাতের তীব্রতা বেড়েছে। গত ছয় বছরে জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৬২জন মানুষ মারা গেছেন। হাওর পাড়ের মানুষদের সুরক্ষায় সরকার বজ্রনিরোধক প্রকল্প হাতে নেয়। এসব বজ্রনিরোধক দণ্ড অপরিকল্পিত স্থাপন ও মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহারে অল্প দিনেই বিকল হয়ে গেছে। মুখথুবরে পড়েছে প্রকল্পটি। তবে স্থানীয়দের দাবী, এতো প্রাণহানির পরও সরকার কৃষকদের নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বজ্রনিরোধক দণ্ড নির্মাণের নামে লুটপাট হয়েছে অর্থ। দেশের অন্যতম খাদ্য উৎপাদনকারী অঞ্চলে কৃষকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি হাওরবাসীর।
জানা গেছে, নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় নেত্রকোনাকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাত প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর গত ছয় বছরে ৬২জনের মৃত্যু হয়। তবুও উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। অকার্যকর “লাইটনিং অ্যারেস্টার” (বজ্রনিরোধক দণ্ড) আর অস্তিত্বহীন “তালগাছ” প্রকল্পের আড়ালে অরক্ষিতই রয়ে গেছে দেশের অন্যতম এই খাদ্যভাণ্ডার অঞ্চলের জনপথ। মাঠজুড়ে পাকা ধান, তবুও আতঙ্কে শ্রমিকরা। বর্তমানে হাওরজুড়ে সোনালি ফসল বোরো ধানের সমারোহ। বাধ্য হয়েই মাঠে নামছেন কৃষকরা। মৃত্যু ভয় নিয়েই যাচ্ছেন ফসল ঘরে তুলতে। প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো হাওরে বজ্রপাত হচ্ছে।
প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, নেত্রকোনায় বজ্রপাতে ২০২০ সালে ৮জন, ২০২১ সালে ১৫জন, ২০২২ সালে ৩জন, ২০২৩ সালে ১২জন, ২০২৪ সালে ৮জন ও ২০২৫ সালে ১৬জন প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মারা গেছেন আরও ৩ জন। কিন্তু এর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশী বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব এলাকায় ধান কাটার মৌসুমে এপ্রিল ও মে মাসেই বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরে বজ্রপাত জনিত মৃত্যু কমাতে ২০২২ সালে নেত্রকোনা জেলায় ৩২টি “লাইটনিং অ্যারেস্টার” (বজ্রনিরোধক দণ্ড) স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী দণ্ডগুলো হাওরে বা খোলা প্রান্তরে স্থাপন করার কথা। এছাড়াও বজ্রপাত প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে সরকার দেশজুড়ে তালগাছ রোপণের প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় নেত্রকোনাও তালগাছ রোপণ করা হয়।
জেলার মদন উপজেলার মাঘান গ্রামের খন্দকার সোহাগ, গোবিন্দশ্রীর আব্দুল হোসেন, খালিয়াজুরী উপজেলার বোয়ালী গ্রামের হদুল মিয়া, ইছাপুরের সুরঞ্জন, সাতগাওয়ের ইকবাল জগন্নাথপুরের এনায়েত কবির, আসাতপুরের পলাশ মাহমুদ সহ অনেকের সাথে কথা হয়। তারা বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করার কথা হাওরের ফাঁকা জায়গায়। কিন্তু অধিকাংশ বজ্র নিরোধক দন্ড বসানো হয়েছে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। এগুলো স্থাপনের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ যন্ত্রই এখন অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। অনেক স্থানে স্থাপিত দণ্ডগুলোর যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে অথবা বিকল হয়ে স্রেফ খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
তালগাছ রোপন প্রকল্পের বিষয়ে তারা আরও বলেন, রোপণকৃত চারাগুলোর বেশিরভাগই পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে। ফলে কয়েক কোটি টাকার এই উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত এই অকার্যকর দণ্ডগুলো মেরামত করে হাওরের প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পুনস্থাপন করা হোক। তাহলে প্রাণহানির নিয়ন্ত্রণ হবে।
জনবসতি এলাকায় অধিকাংশ বজ্রনিরোধক নির্মাণের বিষয়টি স্বীকার করে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ডে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় না ফলে এটি সাধারণত নষ্ট হয় না। দাঁড়ানো থাকলেই হয়। বজ্রনিরোধক দণ্ডে ম্যাগনেট থাকে এর মাধ্যমে ৩০০ফুট এরিয়া কভার করে। খালিয়াজুরি ও কলমাকান্দা উপজেলায় কয়েকটি ফাঁকা জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান এর মোবাইল নাম্বার ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।