রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এছাড়া কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ঋণ প্রদান বা সুশাসন বিষয়ে কোনোরকম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হলে তা সরাসরি তাকে জানানোর জন্য এমডিদের পরামর্শ দেন তিনি।
রোববার ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা জানান। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক ও এবিবির চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে মোট ১৯টি ব্যাংকের এমডি যোগ দেন।
সভার বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরেন এবিবি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, গভর্নর অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন এবং বিনয়, উষ্ণতা ও সৌজন্যের সঙ্গে বৈঠকটি পরিচালনা করেন। তিনি আমাদের ১৯ জনের বক্তব্য একে একে ধৈর্য ধরে শুনছেন এবং তার কয়েকটি মূল অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
মাসরুর আরেফিন জানান, গভর্নর ব্যবসা ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন, যার লক্ষ্য এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তিনি খেলাপি ঋণের কারণে সৃষ্ট অকার্যকর সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহারের বিষয়েও জোর দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো নতুন উৎপাদন বা সেবা খাতে পুনরায় চালুর বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, সভায় গভর্নর ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন। যেমন—কীভাবে অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনিরকে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাতে ব্যাংকগুলো সহায়তা করতে পারে। এভাবে জেলা ও গ্রামভিত্তিক আরও পণ্যকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
মাসরুর আরেফিন বলেন, এ সময় এবিবির পক্ষ থেকে এসএমই অর্থায়নের গুরুত্ব এবং পুনঃঅর্থায়ন প্যাকেজের মাধ্যমে এসএমই খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অব্যাহত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছি।
এবিবি চেয়ারম্যান জানান, সভায় গভর্নর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেগুলো হলো- তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না। ঋণ প্রদান বা সুশাসন বিষয়ে এমডিরা যদি কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হন, তাহলে তা সরাসরি তাকে জানানো। এবিবির উত্থাপিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও তৎপর হবে, যাতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো যায়—যা নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠনসহ চলমান ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ক্রমে কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যার শুরু হবে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত নীতিমালার অধীনে স্বাধীনভাবে ভাড়া এবং লিজিং চুক্তি করার অনুমতি দেওয়া। এছাড়া রপ্তানি প্রণোদনা, ইডিএফ ফেরত এবং রেমিট্যান্স প্রণোদনার বকেয়া অর্থ ছাড় সহজ করতেও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মাসরুর আরেফিন বলেন, আমরা পেশাদার এবং আমরা চাই গভর্নর সফল হোক। তিনি ব্যাংকের এমডিদের প্রধান অংশীজন হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ ছাড়া আমাদের বিদেশি প্রতিনিধি ও ঋণদাতাদের জন্য চলতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি “বাংলাদেশ ডে” আয়োজনের যে ধারণা তিনি দিয়েছেন, আমরা তার প্রশংসা করেছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংকারদের জানিয়েছেন যে চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং নতুন এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সেবার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। নতুন ব্যাংক শাখা খোলার ক্ষেত্রে অফিস স্পেসের জন্য একটি ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করা হবে, যাতে প্রতিবার অনুমোদনের জন্য ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে না হয়।