নানামাত্রিক চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা স্বীকার করেও ভারতের সঙ্গে নতুন ধারার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার জানুয়ারি দশ তারিখ বিকেল পাঁচটার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে প্রণয় ভার্মার সাক্ষাৎ হয়। বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলের যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও প্রচারণা চলার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল।
বৈঠকের মাধ্যমে বিএনপি পরিষ্কারভাবে বার্তা দিতে চেয়েছে যে দলটি ক্ষমতায় গেলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ এবং পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। বিএনপির দৃষ্টিতে, অতীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একতরফা নির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, যা জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে এসে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে হাঁটার কথাই তুলে ধরছে দলটি।
একই দিনে তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্ক ও মিশরের রাষ্ট্রদূতরাও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একাধিক দেশের কূটনীতিকদের এই ধারাবাহিক সাক্ষাৎকে বিএনপি নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক মহলের বাড়তি আগ্রহ হিসেবে দেখছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগ্রহ বেড়েছে। সেই আগ্রহের ধারাবাহিকতায় ভারতের হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা মতবিনিময় করেছেন।
হুমায়ুন কবির জানান, আলোচনায় বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা, কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হতে পারে, তার ইঙ্গিত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তাতেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে এই বার্তাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে, তা অস্বীকার করেননি হুমায়ুন কবির। সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক আস্থার বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে বলে তিনি জানান। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার বিষয়েই প্রণয় ভার্মার সঙ্গে মতবিনিময় হয়েছে। তিনি বলেন, এটি মূলত একটি শুভেচ্ছা সাক্ষাৎ ছিল এবং খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া হয়নি।
বিএনপির দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের পররাষ্ট্রনীতি জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের কথা বলছে। এ লক্ষ্যেই ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করা হচ্ছে।
হুমায়ুন কবির আরও জানান, ভবিষ্যতেও কূটনৈতিকদের সঙ্গে এ ধরনের সৌজন্য ও মতবিনিময়মূলক বৈঠক অব্যাহত থাকবে। আরও অনেক দেশের প্রতিনিধিরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং সেগুলো পর্যায়ক্রমে আয়োজন করা হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বৈঠক ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।