ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে দফায় দফায় মতবিনিময় করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের ঐক্য রক্ষা ও নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দল যাকেই মনোনয়ন দিক, তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, “যারা প্রকৃত বিএনপি কর্মী, তারা কখনো বিএনপিকে ভাঙতে দেবেন না। দল ও দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে।”
সোমবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। এই বৈঠকে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ছিল না, তবে উপস্থিত নেতাদের মাধ্যমে জানা যায়, তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক ঐক্যের গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নানা দিক বিবেচনা করে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। প্রার্থী ঘোষণার পর প্রত্যেকে নিজ নিজ আসনে ফিরে গিয়ে স্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। কারণ স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নির্বাচনী লড়াই সম্ভব নয়।”
বিএনপি নেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানা গেছে, তারেক রহমান মনোনয়ন বঞ্চিতদেরও বিকল্পভাবে মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার পাশে থেকে কাজ করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত মানা প্রত্যেক নেতার দায়িত্ব।”
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এবং দফতরের দায়িত্বে থাকা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল ৪টা থেকে বৈঠক শুরু হয় বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দিয়ে। এরপর সন্ধ্যা ৬টায় হয় খুলনা ও সিলেট বিভাগের প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, এবং রাত ৮টায় শুরু হয় ঢাকা বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক।
সূত্র জানায়, বৈঠকের শুরুতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, “দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি সবাইকে দলীয় নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান।
এদিকে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতা নিজেদের মতামত বা সাংগঠনিক বাস্তবতা তুলে ধরার সুযোগ না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, “তারেক রহমানের সামনে আমরা সচরাচর আসতে পারি না। তাই এলাকার সমস্যা, সম্ভাবনা ও বাস্তব অবস্থা জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
রাজশাহী বিভাগের উপস্থিত নেতাদের মধ্যে ছিলেন মিজানুর রহমান মিনু, মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন, অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেক, ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন, অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ইশা, সৈয়দ শাহীন শওকত, অধ্যাপক কামাল হোসেন ও আবু সাঈদ চাঁদ।
বরিশাল বিভাগের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল–১), রওনাকুল ইসলাম টিপু (বরিশাল–২), রাজীব আহসান (বরিশাল–৪), নজরুল ইসলাম খান (পিরোজপুর–১), গোলাম নবী আলমগীর (ভোলা–১), আলতাফ হোসেন চৌধুরী (পটুয়াখালী–১), নুরুল ইসলাম নয়ন (ভোলা–২) ও নাজিম উদ্দীন আলম (ভোলা–১)।
বৈঠক ঘিরে গুলশান কার্যালয়ের বাইরে দুপুর থেকেই বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী অবস্থান নেন। দলীয়ভাবে জনসমাগম না করার নির্দেশনা থাকলেও বিভিন্ন আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সমর্থকরা সেখানে জড়ো হন, ফলে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
বৈঠকের এক পর্যায়ে তারেক রহমান বলেন, “আমাদের শত্রু অদৃশ্য— যাদের আমরা দেখতে পাই না। দেশি ও বিদেশি অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে আমাদের লড়তে হবে। তাই দলীয় ঐক্যই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র।”
তিনি আহ্বান জানান, দলের প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার করতে, যাতে নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্ত অবস্থানে যেতে পারে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা ছিল— বিএনপি এখন ঐক্যবদ্ধ না হলে দল ও জাতি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু নির্বাচনে অংশ নেওয়া নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা।”