সকালের আলো ফোটার আগেই ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে নাম লেখালেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসীন এই ব্যক্তি—যিনি একদিন নিজেকে তুলনা করতেন ব্রিটিশ বিচারপতি লর্ড ড্যানিংয়ের সঙ্গে, তিনিই আজ হাতে পড়লেন হাতকড়া। মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হলো তার জীবনের নতুন অধ্যায়—অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম, কোনো প্রধান বিচারপতিকে এমনভাবে গ্রেপ্তার করা হলো। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এই পরিণতি কি হঠাৎ? নাকি দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক প্রতারণার একটি স্বাভাবিক ফলাফল?
আসলে যেদিন খায়রুল হক বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের ঐতিহাসিক রায় দেন, সেদিনই তিনি ভবিষ্যতের এই পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন। সেই রায়ে সংক্ষিপ্তভাবে দুই দফা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুমোদন থাকলেও, ১৬ মাস পর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই অংশ ‘আদৌ ছিল কিনা’—সেটাই অস্বীকার করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতেই এই রাজনৈতিক ফরমায়েশি সিদ্ধান্ত নেন।
এরপরই ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে, রক্ত ঝরে রাজপথে, ধ্বংস হয় সম্পদ—আর সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন এক ব্যক্তি: এবিএম খায়রুল হক।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পতনের পুরস্কার হিসেবেই হয়তো তাকে বসানো হয় আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। কিন্তু এখানেও বিতর্ক তাকে ঘিরে রাখে সর্বক্ষণ। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি তাকে পাশ কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দিয়ে নিজের মেয়াদ বাড়িয়ে নেন।
একাধিক অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে প্লট কেলেঙ্কারি পর্যন্ত—সবই উঠে এসেছে সংবাদে, বইয়ে, সংসদে।
প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের কলমে উঠে এসেছে এই বিচারপতির প্রকৃত রূপ: “বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনীতির স্থপতি একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক।”
সেই ‘অরাজনৈতিক ব্যক্তি’ আজ রাজনীতির আগুনে পুড়ছেন। নিজেই যে পথ তৈরি করেছিলেন ক্ষমতার তুষ্টির জন্য, আজ সেই পথই তাকে নিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের কাঠগড়ায়। কোনো রাজা বা বিচারপতি আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই সত্যেরই যেন বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠলেন এবিএম খায়রুল হক।