চার দিনের সরকারি সফরে আগামী ১০ জুন যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এই সফর চলবে ১৩ জুন পর্যন্ত। সফরের মূল সূচিতে থাকছে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার গ্রহণ, পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কূটনৈতিক বৈঠক। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে—এই সফরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ইউনূসের সম্ভাব্য বৈঠক।
চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিএনপির অবস্থানগত দূরত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক যদি হয়, তাহলে তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৪ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রুহুল আলম সিদ্দিক বলেন, “আমরা প্রধান উপদেষ্টার সফরের বিস্তারিত প্রকাশ করেছি, কোনো কিছু গোপন করা হয়নি। তবে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।”
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, যদি বিএনপির পক্ষ থেকে এ ধরনের আগ্রহ আসে, তাহলে সরকারিভাবেই সে বৈঠকের আয়োজন সম্ভব। তার ভাষায়,
“আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পেলে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
সফরের সূচিতে রয়েছে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে বৈঠক, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। ১১ জুন চ্যাথাম হাউসে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় ইউনূস অংশ নেবেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য রাখবেন। সেদিন সন্ধ্যায় কিংস ফাউন্ডেশনের ৩৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজেও তার উপস্থিতি রয়েছে।
এছাড়া ১২ জুন লন্ডনের সেন্ট জেমস’স প্যালেসে ইউনূসকে পরিবেশ, মানবতা ও শান্তির জন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হবে ‘কিংস চার্লস থার্ড হার্মোনি অ্যাওয়ার্ড’। এই পুরস্কার গত বছর পেয়েছিলেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন।
সংবাদ সম্মেলনে ব্রিটেনে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “আমরা অর্থপাচার রোধ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করছি। এবার আলোচনায় সেই প্রসঙ্গও আসতে পারে।” তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিযোগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে অর্থ ফেরত আনা এখন বড় অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।
এই সফর কেবল প্রটোকল ভিত্তিক বিদেশ সফর নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “এই সফরের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অবস্থান জোরদার হবে।”
ব্রিটিশ হাইকমিশনের সূত্র জানিয়েছে, সফরের আগে ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে হাইকমিশনার সারাহ কুকের বৈঠক হয়েছে, যেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে—তারেক রহমানের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়টি। সরকার ও বিএনপির মধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক দূরত্বের এই সময়টায় এমন একটি বৈঠক হলে, তা কেবল প্রতীকী নয়, বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রগতির সূচনা হিসেবেও গণ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—এই বহুল আলোচিত বৈঠক আদৌ হয় কি না।