ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
সেনাপ্রধান জানান, প্রথমত সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেকোনো প্রয়োজনে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দ্বিতীয়ত, সাধারণ জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আস্থা সৃষ্টি করা এবং এই বার্তা দেওয়া—সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী সমন্বিতভাবে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
গতকাল সকালে রাজধানীর গুলিস্তানের জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি স্টেডিয়ামে স্থাপিত সেনাক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী সময়ে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরঞ্জাম পরিবহনে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব বাহিনীর হেলিকপ্টার সারা দেশে মোতায়েন রাখা হবে।
পরে গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে মাঠে থাকবেন ১ লাখ সেনাসদস্য, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি। পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, ভোটারদের নিরাপত্তা ও ব্যালট বাক্স সুরক্ষায় প্রয়োজনে আইনানুগ সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো পরিস্থিতি ঢাকায় সেনাসদর থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক থ্রেট অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারে, সে জন্য উপজেলা ও ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্রভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা মোকাবিলায়ও সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করা হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সেনাসদরে একটি সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সুরক্ষা অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে, পুলিশের কাছে থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর বলেন, এবার প্রথমবারের মতো সেনাসদস্যদের ভোট কেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনে যেখানে সর্বোচ্চ ৪০–৪২ হাজার সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকত, এবার সেখানে ১ লাখ সেনাসদস্য মাঠে রয়েছেন।
তিনি জানান, সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলার ৪১১টি উপজেলায় এবং মহানগর এলাকায় মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান ও চেকপোস্টের মাধ্যমে নজরদারি চলছে।
গত ২০ জানুয়ারি থেকে ১৪ দিনে দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য প্রচারকে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় হুমকি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। অপপ্রচার প্রতিরোধে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।
সেনাবাহিনী কতদিন মাঠে থাকবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন ও প্রত্যাহার সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।