প্রত্যেকটা পরতে পরতে ,সময়ের প্রতিটি ফরে ফরে, আল্লাহর মহিমা নব নব রূপে দীপ্তমান। আকাশের নীলিমা, সাগরের গভীরতা, মাটির পরত, বালুর রেণু, শব্দের তরঙ্গ, প্রাণের বৈচিত্র,পাতার মড়মড়ে শব্দে এগুলি সব সময় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্যায়ন করতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করার মাধ্যমে।
আমাদের জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জীবিকা অর্জন। ইসলামে এই অর্জনকে ফরজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এবং এই পথে কঠোর পরিশ্রমই হলো সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি। কুরআনের সূরা নাজিয়াতে বলা হয়েছে, মানুষকে তার কৃত কর্ম অনুযায়ী ফল দেওয়া হবে।
অর্থাৎ, আমরা যত পরিশ্রম করব, তার ফল ততই বেশি পাব। দুনিয়াতে জীবন যাপন এক অবিরাম সংগ্রাম, আর এই সংগ্রামে সফল হতে হলে আমাদেরকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। রোদের তাপে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঘাম ঝরিয়ে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। এই পরিশ্রমই আমাদের লক্ষ্য অর্জনের পথ খুলে দিবে। ইনশাআল্লাহ ।
কুরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الۡاِنۡسَانُ اِنَّکَ کَادِحٌ اِلٰی رَبِّکَ کَدۡحًا فَمُلٰقِیۡہِ
হে মানুষ! তুমি নিজের প্রতিপালকের কাছে না পৌঁছা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিশ্রম করে যাবে, পরিশেষে তুমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।(সূরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৬)
এই আয়াত আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষা, আর এই পরীক্ষায় সফল হতে হলে আমাদেরকে ক্রমাগত পরিশ্রম করে যেতে হবে। আমাদের কাজের প্রতি লজ্জা না হয়ে, অলসতা ও ফুটানি নিয়ে লজ্জিত হওয়া উচিত।
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেন, لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡ کَبَدٍ
নিশ্চয় আমি মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রম নির্ভর করে সৃষ্টি করেছি। (সূরা আল-বালাদ, আয়াত: ৪)
অর্থাৎ, মানুষের স্বভাবই হলো পরিশ্রম করা। পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য এবং সফলতার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা দিনের আলোকে সৃষ্টি করেছেন আমাদের কাজ করার জন্য। সূরা নাবাতে বলা হয়েছে, وَّجَعَلۡنَا النَّهَارَ مَعَاشًا
আর দিনকে বানিয়েছি কাজের জন্য।(সূরা নাবা, আয়াত: ১১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দিনের আলো আমাদেরকে কাজ করার জন্য দেওয়া হয়েছে, যাতে আমরা রাতে বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী দিন আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা এই সময়ের সদ্ব্যবহার না করে, প্রাপ্ত সুযোগ হারিয়ে ফেলছি।
ইসলামে নামাজের পরপরই পরিশ্রমের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। সূরা জুময়ায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, فَاِذَا قُضِیَتِ الصَّلٰوۃُ فَانۡتَشِرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَابۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِ اللّٰہِ وَاذۡکُرُوا اللّٰہَ کَثِیۡرًا لَّعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ
যখন তোমাদের নামাজ শেষ হয়ে যাবে, তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, এবং আল্লাহকে স্মরণ কর বেশি বেশি, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সূরা জুমা, আয়াত: ১০)
এই আয়াত আমাদের জানায় যে, নামাজ আদায়ের পর শুধু মসজিদে বসে থাকা নয়; বরং পার্থিব জীবনের সফলতার জন্যও পরিশ্রম করতে হবে।
ইসলাম পরিশ্রমে বিশ্বাসী, হাদিস শরিফে এসেছে, وَعَنِ الْمِقدَامِ بنِ مَعْدِيْكَرِبَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ مَا أكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أنْ يَأكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِه وَإنَّ نَبيَّ الله دَاوُدَ كَانَ يَأكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ رواه البخاري
নিজের হাতের উপার্জন থেকে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি। হযরত দাউদ আ. যিনি নিজ হাতে বর্মা বানিয়ে জীবিকা অর্জন করতেন।(বুখারী, হাদিস: ২০৭২) এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে পরিশ্রমকে প্রচণ্ড গুরুত্ব দেয় হয়েছে।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন একজন কঠোর পরিশ্রমী ব্যক্তি। তাঁর প্রথম কর্মজীবন ছিল রাখাল হিসেবে, যেখানে তিনি মক্কাবাসীদের জন্য বকরি চরাতেন। হাদিসে এসেছে, وَعَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ مَا بَعَثَ اللهُ نَبِيّاً إِلاَّ رَعَى الْغَنَمَ فَقَالَ أصْحَابُهُ : وأنْتَ ؟ قَالَ نَعَمْ كُنْتُ أرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيطَ لأَهْلِ مَكَّةَ رواه البخاري
আল্লাহ তায়ালা এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি, যিনি বকরী চাড়াননি। (বুখারী, হাদিস: ২২৬২)
এটা প্রমাণ করে যে, নবীগণ সাধারণ মানুষের মতো পরিশ্রমী ছিলেন এবং তাঁরা দেখিয়েছেন , যে কোনো কাজই সম্মানজনক, জীবনকে সুন্দর করতে কঠোর প্ররিশ্রম করার কনো বিকল্প নেই ।
বিশ্বনবী সা. এর সাহাবীগণও পরিশ্রমী ছিলেন। কেউ খেজুর বাগানে কাজ করতেন, কেউ কৃষি কাজ করতেন, কেউ ব্যবসা করতেন। তারা প্রত্যেকে নিজেদের জীবিকা অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের পরিশ্রমী জীবন আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে। সাহাবীগণের এই পরিশ্রম আমাদের শেখায় যে, সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রম করা অপরিহার্য, এবং কোনো কাজই ছোট নয়।
নতুন বছরে আমরা সবাই যেন এই শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলতে পারি, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শক্তি ও সাহস দান করুন, যেন আমরা প্রতিটি কাজে সফলতা লাভ করতে পারি। আমিন।