আতিকুর রহমান, রাবি প্রতিনিধি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে চলছে নানা আলোচনা ও মূল্যায়ন। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন রয়েছে পরিবর্তনের প্রত্যাশা, তেমনি রয়েছে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিয়ে বাস্তবধর্মী চিন্তা।
রাবি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ জাতীয় নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। তাঁদের ভাবনায়, নিয়মিত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামত প্রতিফলনের প্রধান পথ। দীর্ঘ সময় পর একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় তরুণদের মধ্যে ভোটাধিকার ও নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা রাবি শিক্ষার্থীদের ভাবনার কেন্দ্রীয় বিষয়। ক্যাম্পাস আলোচনায় উঠে আসছে—ভোটের পরিবেশ কতটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও কর্মসূচি। শিক্ষার্থীরা নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই বিষয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তরুণদের সমস্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিও তাঁদের ভাবনায় রয়েছে।
ক্যাম্পাস রাজনীতির প্রভাবও আলোচনায় আসছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধারণা রয়েছে—জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শিক্ষাঙ্গনে সহনশীলতা বজায় রাখা এবং শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টিও তাঁদের ভাবনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুরাইয়া মাহমুদ শিশির বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। জনগণের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন পুরোপুরি নিশ্চিত হয়।
তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গবেষণার বিষয়গুলো নির্বাচনে গুরুত্ব পাক এবং এই নির্বাচন সহিংসতা ও দলীয় দখলদারিত্বের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পথে ভূমিকা রাখুক—এটাই আমার প্রত্যাশা।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীর জয়নাল ইসলাম সাদেক বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক, যাতে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হয়।
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা গঠনে গুরুত্ব দেবেন—এটাই আমার প্রত্যাশা। সহিংসতা ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের প্রতি তরুণদের আস্থা বাড়বে এবং দেশ সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের পথে এগোবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিন ইশরাত দীনা বলেন, ‘আমি চাই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হোক, কোনো কারচুপি বা সহিংসতা যেন না ঘটে। যে দলই সরকার গঠন করুক, তারা জনগণের প্রতি জবাবদিহি রাখুক এবং জনগণের স্বার্থকে প্রথমে গুরুত্ব দিক।
পরিবারতন্ত্রভিত্তিক শাসন হোক না, ক্ষমতার জন্য একক শাসনের মানসিকতা বাদ পড়ুক। সাধারণ মানুষের কাছে আহ্বান—ভোট দিন প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী, শুধু দলীয় প্রতীকে নয়।’
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সুইটি বিশ্বাস বলেন, ‘গণভোট জনগণের সরাসরি মত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মাধ্যম। বাংলাদেশের সংবিধানেও জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা গণভোটের ধারণাকে আরও গুরুত্ব দেয়।
জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে সাংবিধানিক বা নীতিগত বিষয়ে জনগণের মতামত জানার কার্যকর উপায় হতে পারে গণভোট। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণভোট সফল করতে হলে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং জনগণের কাছে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে আমি শুধু ভোট দেওয়ার বিষয় নয়, বরং আগামীর বাংলাদেশ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখি। এই নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়—এটাই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা।
শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা এখন খুব জরুরি। নির্বাচনের মাধ্যমে এমন নেতৃত্ব আসুক, যারা সৎ ও দায়িত্বশীল হবে এবং তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তব ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।’
সব মিলিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। প্রত্যাশা ও সংশয়ের মধ্য দিয়ে রাবি ক্যাম্পাস এখন তাকিয়ে আছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে।