রোকুনুজ্জামান, জবি
বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে ‘ঘৃণার প্রতীক’ হিসেবে পাকিস্তানের পতাকা আঁকার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে তীব্র উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় পতাকা আঁকতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আরেকদল শিক্ষার্থী বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় এক সাংবাদিক লাঞ্ছনার শিকার হন এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অংশগ্রহণে সড়কে পাকিস্তানের পতাকা এঁকে তাতে জুতার ছাপ দেওয়া হয়।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার পর বিজয় দিবস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে একদল শিক্ষার্থী পাকিস্তানের পতাকা আঁকার উদ্যোগ নেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, একাত্তরের গণহত্যা, নির্যাতন ও পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার স্মরণে এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই ‘ঘৃণার প্রতীক’ আঁকার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পতাকা আঁকার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কাজ না করার পরামর্শ দেন। এতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রক্টরের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তোলেন, এর আগে ক্যাম্পাসে ইসরায়েলের পতাকা আঁকার সময় অনুমতির প্রয়োজন না হলে এবার কেন তা লাগবে। একপর্যায়ে প্রক্টর ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
এরপর আস-সুন্নাহ আবাসিক হলের একটি বাস ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় পতাকা আঁকতে থাকা শিক্ষার্থীরা বাসটিকে বিকল্প ফটক ব্যবহারের অনুরোধ জানান। এ সময় বাস থেকে এক শিক্ষার্থী নেমে মন্তব্য করেন, “পাকিস্তানের পতাকা আঁকা ঠিক হচ্ছে না ভাই, তাদের সঙ্গে আমাদের এখন মিউচুয়াল হচ্ছে।” এই মন্তব্যে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বাসে থাকা শিক্ষার্থীদের একাংশ নেমে এসে পতাকা আঁকায় যুক্তদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায় এবং রঙের কৌটা ঢেলে সড়কে আঁকা পতাকা মুছে দেয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও সরাসরি সম্প্রচার করার সময় লাঞ্ছনার শিকার হন দৈনিক কালের কণ্ঠের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মিনহাজুল ইসলাম। অভিযোগ উঠেছে, লাইভ চলাকালেই তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে চাইলে একদল শিক্ষার্থী তার গাড়ির সামনে অবস্থান নেন। প্রায় আধা ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তিনি প্রশাসনিক ভবনে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে রাত দেড়টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ঝটিকা মিছিল বের করে। মিছিল শেষে তারা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে সড়কে পাকিস্তানের আরেকটি পতাকা এঁকে তাতে জুতার ছাপ দেন।
লাঞ্ছনার শিকার সাংবাদিক মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “অনুমতির অজুহাতে যদি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে বিজয় দিবসে যারা পাকিস্তানপ্রীতির প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, “একাত্তরের ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই প্রতীকী কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। পাকিস্তানের দালালরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং সাংবাদিকদেরও লাঞ্ছিত করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
পতাকা আঁকায় বাধা ও হামলার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলেও বেলা ১১টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে এমন কোনো কর্মসূচি পালিত হতে দেখা যায়নি। তবে সাংবাদিক লাঞ্ছনার ঘটনায় প্রক্টর লিখিত অভিযোগ ও ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।