মোঃ হাসনাইন আহম্মেদ, ভোলা
শিশুর গলায় ঝুলবে ছোট্ট একটি লকেট। ওজন মাত্র দুই গ্রাম। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে সেটাই হয়ে উঠবে জীবন বাঁচানোর অ্যালার্ম।
ভোলার তরুণ উদ্ভাবক মো. তাহসিন এমনই এক অভিনব ডিভাইস তৈরি করেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’। শিশুটি যদি কোনোভাবে পানিতে পড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইসটি সাইরেন বাজিয়ে আশপাশকে সতর্ক করবে। একই সময় অভিভাবকের মোবাইল ফোনে চলে যাবে একটি কল। প্রয়োজনে জিপিএসের মাধ্যমে জানা যাবে শিশুটি ঠিক কোথায় পড়েছে।
এই উদ্ভাবনের পেছনে আছে গভীর এক ব্যক্তিগত শোক। তাহসিনের দুই খালাতো বোন বাড়ির পুকুরে পড়ে মারা যায়। সেই ঘটনা তাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আর কোনো পরিবার যেন এভাবে সন্তান হারাতে না হয়।
প্রায় আট থেকে নয় মাস গবেষণা ও পরীক্ষার পর তিনি এই ডিভাইসটি তৈরি করতে সক্ষম হন।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে ভোলা পৌরসভার পুকুরে ডিভাইসটির একটি বাস্তব পরীক্ষা চালানো হয়। সাঁতার না জানা এক শিশু যখন পানিতে নামে, তখনই কানে ভেসে আসে জোরালো সাইরেন। মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। শিশুটিকে উদ্ধার করা হয় নিরাপদে। পুরো দৃশ্যটি দেখতে পুকুরপাড়ে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ।
তাহসিন জানান, প্রথমদিকে ডিভাইসটি আকারে বড় ও ভারী ছিল। পরে অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটিকে লকেটের মতো ছোট করে আনা হয়েছে। এখন শিশুর গলায় ঝোলানো অংশটির ওজন মাত্র দুই গ্রাম। অভিভাবকের কাছে থাকবে একটি পোর্টেবল রিসিভার।
ডিভাইসটি তৈরি হয়েছে ইএসপি–৩২, জিএসএম মডিউল, ৩১৫ মেগাহার্টজ ট্রান্সমিটার, রিসিভার, ব্যাটারি ও কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ দিয়ে। শিশুর শরীরে থাকা ডিভাইসটি পানির সংস্পর্শে এলেই পানি দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে রিসিভারে সংকেত পাঠায়। তখনই সাইরেন বেজে ওঠে এবং মোবাইলে কল চলে যায়। প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মিটার এলাকার মধ্যে এটি কার্যকর।
তাহসিনের এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা গেলে একটি ডিভাইস ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যেই বাজারে আনা সম্ভব হবে।
২০০৭ সালে ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাটে জন্ম তাহসিনের। তিনি ২০২৪ সালে হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। শিক্ষক কারি আবদুল হালিমের তৃতীয় সন্তান , বর্তমানে ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল বিভাগে দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়ছেন।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ভোলা একটি দ্বীপ জেলা হওয়ায় এখানে পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর হার বেশি। তাহসিন যে ডিভাইসটি তৈরি করেছে, তা এই মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একটি শিশুর জীবন বাঁচালেও এ উদ্ভাবন সফল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া হবে।
ভোলা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মনিরুল ইসলামও ডিভাইসটি দেখে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নদী আর পুকুরে ঘেরা ভোলায় শিশুদের ডুবে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তাহসিনের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ডিভাইসটির আরও উন্নয়নে প্রয়োজন হলে আমরা সহযোগিতা করব এবং অভিভাবকদের মধ্যে এটি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করব।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যাপক উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হলে এই ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ উপকূলীয় এলাকাসহ সারা দেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।