মোঃ হাসনাইন আহমেদ, ভোলা:
“গাঙে (নদী) আমাগো সব লইয়া গ্যাছে, আমাগো বাপদাদার ভিটেমাটির উপর দিয়া এহন জাহাজ চলে। চোখের পলকে সব ভাইঙা লইয়া গ্যাছে গাঙে। এহন আবার গাঙ ধারে আ্যইয়া পড়ছে, আমরা কই যামু।” এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের কালিকীর্তি গ্রামের বাসিন্দা বাসিন্দা আ.খালেক মাঝি।
তিনি ৮০ বছরের বৃদ্ধ। মেঘনার তীব্র ভাঙনে এই বয়সেও ভিটেমাটি হারানোর চিন্তায় রয়েছেন। এই পযর্ন্ত মেঘনার কাছে বসতভিটা হারিয়েছেন ৩ বার। তীব্র ভাঙনে এবারও বসতভিটার কাছে চলে এসেছে নদী।
রাতে কখনো কখনো মেঘনার তীব্র গর্জনে ঘুম ভেঙে যায় তার। গেল দু’দিন আগে টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনিও।
মেঘনার তীব্র ভাঙনে তার মত অসহায় হাজার হাজার বাসিন্দা। ভাঙনে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। হুমকির মুখে পড়েছে শত শত বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য মাছের ঘের।
ভোলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার পূর্বদিকে রয়েছে শিবপুর ইউনিয়ন। তার পাশে রয়েছে প্বার্শবর্তী দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়ন। এই দুই ইউনিয়নের ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। শহররক্ষা বাঁধ থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিটার দুরে আছে। অতি জোয়ারে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়ার শঙ্কায় দিনপার করেছেন এখানকার মানুষ।
মানচিত্র থেকে বিলীনের পথে এই দুই ইউনিয়ন। এরই মধ্যে ইউনিয়ন দু’টির আয়তনের অর্ধেক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিলুপ্ত হয়ে প্রাচীনতম বেশ কিছু নিদর্শন। এছাড়াও হুমকির মুখে ১২ টি শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান, ২টি মাদ্রাসা, ৪টি বাজার ও অসংখ্য মসজিদ।
ইউনিয়ন দুটির বাকি অংশ বাঁচাতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ চেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি করেছে এই দুই ইউনিয়নের মানুষ।
গেল সোমবার সকালে ভোলা – চরফ্যাশন আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর সড়ক অবরোধ করে প্রায় ঘন্টা ব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি করেন তারা। এ সময় তারা ‘ আমার মাটি আমার মা, বিলীন হতে দেব না’ ‘ভাইঙা গেলে বসতবাড়ি, আমরা দিবো গলায় দড়ি’ ‘বালি বস্তার সাত্বনা, মানি না মানবো না’ ‘দাবী মোদের একটাই, টেকসই বাঁধ চাই’ মানলে দাবী সাধুবাদ, নইলে হবে প্রতিবাদ’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
পরে, পানি উন্নয়ন দেওয়া আশ্বাসে ঘেরাও কর্মসূচি পত্যাহার করেন তারা। এর আগেও, নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান চেয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি করছেন এখানকার মানুষ।
ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) সূত্রে জানা যায়, গেল ৫০ বছরে ভোলার মানচিত্র থেকে মেঘনার পেটে বিলীন হয়েছে ২৫৭ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বছরে বিলীন হচ্ছে ২ থেকে ৩ বর্গকিলোমিটার। তবে, এই পর্যন্ত কি পরিমাণ মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছেন তার নির্দিষ্ট কোন তালিকা বা হিসেব নেই স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে।
এদিকে, ভাঙা গড়ার খেলায় দিন দিন ছোট হয়ে আসছে দ্বীপজেলা ভোলার মানচিত্র, হুমকির মুখে জেলা শহরসহ বহু স্থাপনা। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাসকূপ গুলো অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী শাসনে স্থায়ী কোন বৃহৎ প্রকল্প গ্রহন না করায় অস্তিত্ব হারাতে বসেছে এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। শুধু জিও ব্যাগ ডাম্পিং দ্বারাই নদী ভাঙন ঠেকাতে চায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। অভিযোগ, এ রকম অকার্যকর পদ্ধতিতে ক্ষতি হচ্ছে শুধু রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা। ভাঙন রোধে কার্যকর কিছুই হচ্ছে না।
শিবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এ.কে.এম. নুর হোসেন মিয়া বলেন, ‘ মেঘনার তীব্র ভাঙনে দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে শিবপুর ইউনিয়ন। নদী ভাঙন রোধ চেয়ে ঢাকায় বহু আন্দোলন সংগ্রাম করলাম।
তাতেও সরকার কোন ভুমিকা নিচ্ছে না। তাই গেল সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ড ঘেরাও করেছি। তারা দুই মাসের মধ্যে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ দ্বারা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’
আরেক বাসিন্দা ইয়াসির আরাফাত সোহাগ বলেন, ‘ মেঘনার ভাঙনে ইতিমধ্যে আমাদের একটি মাছঘাট ভেঙে গেছে। গরীবের দুই খ্যাত বালুর মাঠটি অর্ধেক ভেঙে মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে।’
আরেক বাসিন্দা আবুল বশার বলেন, ‘ বাবা-মায়ের ভিটেমাটি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখান আবার আমার নিজের ভিটেমাটি টুকুও নদীগর্ভে যাওয়ার পালা। নদী শাসনে সরকারের কার্যকর কোন ভূমিকা নেই। এভাবে চলতে থাকলে ভোলা মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে।’
মেদুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, ‘ মেঘনার গর্জনে মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। চিন্তায় থাকি রাতের আধাঁরে কখন যেন ভেঙে সব নিয়ে চলে যায়। এবার ভাঙলে আর কোথায়ও যাওয়ার উপায় থাকবে না। টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে মেঘনার ভাঙন থেকে আমাদের রক্ষা করার জোড় দাবী জানাচ্ছি সরকারের কাছে।’
এছাড়াও ভোলার রাজাপুর, কাঁচিয়া ও মাঝের চরের তীব্র ভাঙনেও বিলীন হয়েছে কয়েক কিলোমিটার এলাকা। সেখান বাসিন্দারাও ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। গেল দুই মাসে মেঘনার ভাঙনে শিকার হয়ে বসতভিটা হারিয়েছেন প্রায় শতাধিক বসতবাড়ি, একটি বাজার, মাছঘাটসহ ২টি মক্তব।
সম্প্রতি ভোলার ভাঙন কবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এনামুল হক। তিনি সদর উপজেলার ভাঙ্গনকবলিত শিবপুর ইউনিয়নের মাছঘাট ও স্লুইজগেট এলাকাও পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন, ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মিজানুর রহমান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান।
পরে, ভোলার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, এটি অনুমোদন হলে নদী ভাঙন সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন কর্মকর্তারা।
ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়া উদ্দিন আরিফ জানান, মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুব শীঘ্রই কাজ শুরু করা হবে। আপাতত জিও ব্যাগ ও ডাম্পিং পদ্ধতির মাধ্যমে নদী ভাঙন কিছুটা রোধ করার চেষ্টা চলছে।