নেত্রকোনা প্রতিনিধি :
টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসির) ক্যাম্পাসে “নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়” শুরু থেকে পাঠ দান সহ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনে জনশক্তি, শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় টিটিসির ডরমেটরি ভবনের কক্ষ ব্যবহারের অনুমতি দেন।
কিন্তু অনুমতি না পেলেও টিটিসি একাডেমিক ভবনের চতুর্থ তলায় শ্রেণী কক্ষ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহার করে আসছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবী সমঝোতার মাধ্যমেই টিটিসির একাডেমিক ভবনে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
একই ভবনে টিটিসির প্রশিক্ষণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ দান হওয়ায় প্রায়ই ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা। এতে টিটিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গতিশীল করতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সরিয়ে নিতে জনশক্তি, শ্রম ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাঠিয়েছেন টিটিসি কর্তৃপক্ষ।
নেত্রকোনা টিটিসি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি নেত্রকোনা জেলার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠান হতে ১০টি উপজেলার কয়েক হাজার বিদেশগামী মহিলা ও পুরুষ কর্মী প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন ও বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষতার সনদ অর্জন করে বিদেশে কাজের জন্য যাচ্ছে।
দক্ষতা অর্জন করে তারা দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণ করেন। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেটি জেলার বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের জন্য কম্পিউটার, গ্রাফিক্স, সুইং মেশিন অপারেশন, ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, অটোক্যাড, প্লাম্বিং এন্ড পাইপ ফিটিং, ড্রাইভিং, টেইলারিং এন্ড ড্রেস মেকিং ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা কোর্সসমূহ চালু রয়েছে।
রাজস্ব বাজেটে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নে এসব কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন টিটিসির ক্যাম্পাসে ১১টি ট্রেডে নিয়মিত ১হাজার ৬০জন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসেন। ২একরের এ ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে,
২০সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে ক্যাম্পাস বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে পত্র প্রেরণ করেন। পরে ১অক্টোবর ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসক টিটিসির অধ্যক্ষকে ডরমেটরি ভবনের কক্ষ ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের জন্য পত্র প্রেরণ করেন।
পরে টিটিসির অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) কক্ষ বরাদ্দের জন্য ২অক্টোবর ২০১৮ সালে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালকের চিঠি প্রেরণ করেন। ১৫অক্টোবর ২০১৮ সালে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো মহাপরিচালক অস্থায়ী ভিত্তিতে ডরমিটরীর ভবনের কয়েকটি কক্ষে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদনের জন্য সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠান।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২৮অক্টোবর ২০১৮ সালে ৩৪৩ নং স্মারকে টিটিসির ডরমিটরীর কয়েকটি কক্ষ ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করা হয়। ওই সেশনে বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি ও কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ১২০জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু হয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরসহ ৭শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। ১২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়ে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস, মাইক্রোবাস ও এ্যাম্বুলেন্সসহ ১৩টি গাড়ি রয়েছে।
টিটিসি ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় হতে অনুমোদিত ডরমিটরীর ভবনের কক্ষ গুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিচ তলার অর্ধেক অংশ, ২য় তলার সকল কক্ষ এবং ৩য় তলার একটি কক্ষ বাদে সবকয়টি কক্ষ সবকটি দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যবহার করে আসছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ব্যতিত একাডেমিক ভবনের ৪র্থ তলার সবকয়টি ল্যাব ও ক্লাসরুম ব্যবহার করছেন। তাদের ব্যবহৃত সকল কক্ষ এবং কম্পিউটার ল্যাবের বিদ্যুৎ বিল টিটিসি পরিশোধ করছে। টিটিসির অনেক ফার্নিচার বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহার করছেন এবং প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারের জন্য ফার্নিচারসমূহ ২-৩ টি কক্ষে স্টোর করে রাখার কারণে এগুলো নষ্ট হচ্ছে।
টিটিসির প্রশিক্ষণার্থী ফরিদ শেখ, কামাল, হৃদয়, নাজমা আক্তার সহ অনেকেই বলেন, টিটিসিতে বিভিন্ন বয়সের লোকজন প্রশিক্ষণ নেন। বিশেষ করে পরিবারের হাল ধরতে অনেকেই প্রশিক্ষিত হয়ে বিদেশে গমন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কম বয়সের।
তাদের চাল চলনে অনেক প্রশিক্ষণার্থী বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। এমনকি প্রায় সময় প্রশিক্ষণার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। আমরা চাই দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হোক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, টিটিসির ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যক্রম চলমান। ফলে আমরা স্বাধীন পরিবেশ পাচ্ছি না। প্রতিযোগিতার এ সময়ে লেখাপড়ারও পরিবেশ নেই। নেই গ্রন্থাগার। পাঠদানের উপযোগী করে নিজস্ব ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিফট করা প্রয়োজন।
নেত্রকোনা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, টিটিসির ক্যাম্পাসে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু থেকে পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় এখানে থাকায় টিটিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।
এ কারণে জাপানী ভাষার কোর্স চালু করতে পারছিনা। প্রায় সময়ই প্রশিক্ষণার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এছাড়াও অনুমতি না পেলেও টিটিসির একাডেমি ভবনের ৪র্থ তলা ব্যবহার করছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষের বিদ্যুৎ বিলও টিটিসি পরিশোধ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় সরিয়ে নেওয়ার জন্য অধিদপ্তরের চিঠি পাঠিয়েছি।
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার হারুন-অর-রশিদ বলেন, ২০১৮-১৯ সেশনে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম টিটিসি ক্যাম্পাসে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো অনুমোদন নিয়ে শুরু হয়। তবে টিটিসির একাডেমি ভবনের শ্রেনী কার্যক্রম উভয় পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমেই শুরু হয়।
বিদ্যুৎ বিলের বিষয়টি শিকার করে তিনি বলেন, একাডেমিক ভবনের বিদ্যুৎ বিল টিটিসি দিচ্ছে। অপরদিকে ডরমেটরী ভবনে টিটিসির স্টাফদের আবাসনের চতুর্থ তলার বিদ্যুৎ বিল বিশ্ববিদ্যালয় পরিশোধ করছে।