রাশিমুল হক রিমন, বরগুনা:
বরগুনার আমতলী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ঘোপখালী। সবুজে ঘেরা গ্রামের নীরবতা ভেদ করে চোখে পড়ে লাল-ধূসর ইটের এক বিশাল পুরোনো ভবন। গাছপালা ও নির্জনতার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটি যেন প্রকৃতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। একসময় তিনতলা বিশিষ্ট ছিল এই বাড়ি, তবে তৃতীয় তলার বড় অংশ ধসে পড়ায় এখন দৃশ্যমান কেবল দুইতলা।
ভবনটির স্থাপত্যে স্পষ্ট ব্রিটিশ আমলের প্রভাব রোমান-গথিক ধাঁচের অর্ধবৃত্তাকার খিলান, খোদাই করা থাম, অলংকৃত জানালা এবং গম্বুজধর্মী কাঠামো। নিচতলার সাতটি খিলান মিলিয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ বারান্দা, যার প্রতিটির ওপর রুফ-কার্নিশে রয়েছে সূক্ষ্ম অলংকরণ। ২৪ ফুট চওড়া ইট-চুন-সুরকির দেয়াল আজও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও, কাঠের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, রঙিন কাচ চূর্ণ হয়ে পড়েছে, আর ছাদ থেকে ঝরে পড়ছে মাটি ও ধুলা।
বর্তমান বাসিন্দা কলেজশিক্ষক বাছের উদ্দিন জানান, এই বাড়ির নির্মাতা ছিলেন ফটিক হাওলাদার তাঁর ষষ্ঠ প্রজন্মের পূর্বপুরুষ। ফটিকের বাবা ঝরু হাওলাদার আঠারো শতকে পটুয়াখালীর বাউফল থেকে ঘোপখালী এলাকায় আসেন। সে সময় বনজঙ্গলে ভরা এলাকা সাফ করে তিনি বসতি গড়ে তোলেন এবং প্রচুর জমি ‘হাওলা’ নেন। বাবার মৃত্যুর পর ফটিক হাওলাদার জমির মালিকানা পান এবং উনিশ শতকের গোড়ার দিকে তালুক অর্জন করে পরিবারটির পদবি হয় তালুকদার। নিজেদের বংশ সম্পর্কে বাছের উদ্দিন বলেন, ফটিক হাওলাদারের তিন ছেলে ছিলেন। এই তিন ছেলের ১২ ছেলে ছিলেন।
তাঁর আমলে পরিবারটি ব্যাপক বিত্তশালী হয়। ফটিক হাওলাদারের প্রায় এক হাজার একর ফসলি জমি ছিল, যা তিনি ওয়াক্ফ করেন। বর্তমানে সরকার অধিগ্রহণ ও অন্যান্য কারণে তাঁদের এস্টেটে অবশিষ্ট রয়েছে প্রায় ৯১ একর জমি।
বাড়ির উত্তর পাশে রয়েছে এক একর আয়তনের শানবাঁধানো পুকুর ও ঘাট, দক্ষিণে কাছারিঘর, আর উত্তরে পুরোনো মসজিদ—যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে। মসজিদের পাশেই শায়িত ফটিক হাওলাদার ও তাঁর পিতা ঝরু হাওলাদারের কবর। বাড়ির আশপাশে সাত-আটটি ছোট ছোট বাড়িতে বসবাস করছেন বংশধরেরা।
৭৩ বছর বয়সী মুশফিকুর রহমান, ফটিক হাওলাদারের নাতি বলেন, দাদাকে আমি দেখিনি। তিনি সম্ভবত ১৯২০ সালের দিকে মারা যান। কলকাতা থেকে মিস্ত্রি এনে এই ভবন নির্মাণ করেছিলেন এবং আসবাবপত্রও সেখান থেকে এনেছিলেন। বহু আগেই ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। যদি সংরক্ষণ করা হতো, পরের প্রজন্ম ইতিহাস জানতে পারত।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোকনুজ্জামান খাঁন বলেন, ঘোপখালী গ্রামের প্রাচীন ঐতিহ্যের বিষয়ে আপনারা আমাকে অবহিত করেছেন, যা জানার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগলো। বিষয়টি নিয়ে আমি বরগুনা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আলোচনা করব তিনি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিবেন।