পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর প্রায় দুই লাখ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। উপজেলার ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়রা। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে হাসপাতালটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও আগুনমুখা নদীবেষ্টিত রাঙ্গাবালী উপজেলা তিনদিকে নদী ও একদিকে সাগরঘেরা দ্বীপাঞ্চল। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই অঞ্চলে এখনো নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল কিংবা সরকারি এমবিবিএস চিকিৎসক। ফলে জরুরি চিকিৎসার জন্য স্থানীয়দের ভয়াল আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় পার্শ্ববর্তী গলাচিপা বা কলাপাড়া উপজেলা হাসপাতালে। গুরুতর রোগীদের অনেক সময় যেতে হয় জেলা সদর পটুয়াখালী বা বিভাগীয় শহর বরিশালে।
নৌ-যোগাযোগ দিনের বেলায় সীমিত থাকলেও সন্ধ্যার পর প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ায় অনেক সময় দিনেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া হয়ে পড়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
জানা গেছে, ২০১২ সালে রাঙ্গাবালী উপজেলা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০২৩ সালে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট সংকটের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চারতলা হাসপাতাল ভবনের তিনটি ছাদের ঢালাই ও নিচতলার আংশিক দেয়ালের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া দুটি কোয়ার্টার ভবন, একটি সাব-স্টেশন, বাউন্ডারি ওয়াল ও অভ্যন্তরীণ সড়কের আংশিক কাজ সম্পন্ন হলেও দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। বাইরে বেরিয়ে থাকা লোহার রডে মরিচা ধরতে শুরু করেছে।
রাঙ্গাবালী হাই মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহেলা পারভীন বলেন, “উপজেলা প্রতিষ্ঠার এক যুগ পার হলেও এখানে এখনো একটি সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। দ্রুত হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ করা জরুরি।”
বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার হোসেন আহমেদ বলেন, “এ এলাকায় এখনো উন্নত চিকিৎসাসেবা নেই। অনেক গর্ভবতী নারী সিজারের জন্য অন্য উপজেলায় যেতে বাধ্য হন। সাপে কামড়ানো রোগীদের জন্য এন্টিভেনম না থাকায় অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চালু করা প্রয়োজন।”
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার রাঙ্গাবালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি ধাপে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল এক বছর। নির্ধারিত সময়ে প্রথম ধাপের ৫৩ শতাংশ ও দ্বিতীয় ধাপের ৫৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও গত বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে।
পটুয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, প্রকল্পটি আবার নতুন করে অনুমোদন পেয়েছে এবং বর্তমানে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের পর এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি নতুন করে একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত কাজ শুরু হবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ ভূঞা জানান, হাসপাতালটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।