মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর ইউনিয়নের ভূইয়া পাড়া এলাকায় সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত বিষয়ক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের পৈতৃক বাড়ির সামনে একটি সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে এলাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, রাস্তা সম্প্রসারণে যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি এবং প্রভাব খাটানো হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ বলছেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতেই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক কোটি টাকার একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প দরপত্রের মাধ্যমে ১০ শতাংশ কম মূল্যে ৯০ লাখ টাকায় পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওরিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার। প্রকল্প অনুযায়ী রাস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ মিটার এবং প্রস্থ ১২ ফুট নির্ধারণ করা হয়। তবে একটি মোড়ে জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা দেখা দিলে সেখানে আরও ৪ ফুট বাড়িয়ে রাস্তার প্রস্থ ১৬ ফুট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে রাস্তাটি কাঁচা ছিল এবং বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে যেত। এতে এলাকার মানুষকে কাদা ও পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হতো। বর্তমানে রাস্তা নির্মাণের পর আশপাশের এলাকার মানুষ বাজার, স্কুলসহ বিভিন্ন কাজে সহজে যাতায়াত করতে পারছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমল থেকেই ষোলঘর বাজার থেকে কুমারবাড়ির ওপর দিয়ে ভূইয়া পাড়ার ভেতর দিয়ে একটি চলাচলের পথ ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ওই জমির মালিক হিন্দু পরিবার ভারতে চলে গেলে জমিটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে জাল দলিলের মাধ্যমে জমিটি দখল করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ওই ১৬ ফুট প্রশস্ত পথে ইট বিছানো হয়। কিন্তু ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় জমিটি পুনরায় দখলে নেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০০৭ সালে একটি দেওয়ানি মামলা করা হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, সিএস রেকর্ডভুক্ত হিন্দু মালিকরা দেশভাগের সময় ভারতে চলে যাওয়ায় ২৪ শতাংশ জমি সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত হবে এবং জমির ওপর করা দলিল বাতিল করা হবে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক অসহযোগিতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিম্ন আদালতে সরকার মামলায় পরাজিত হয়।
পরে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জেলা প্রশাসন বিষয়টি হাইকোর্টে আপিল করলে নিম্ন আদালতের রায় খারিজ করা হয়। আদালত রুবেল গংয়ের ১২ শতাংশ জমির স্বত্ব বাতিল করেন এবং বাকি ১২ শতাংশ জমির দলিল যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। এরপর ওই জমির একটি অংশ খাস খতিয়ানভুক্ত করে সেখানে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এদিকে রাস্তা নির্মাণের পর থেকেই একটি পক্ষ বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সহায়তায় জমি দখলসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, রাস্তা সম্প্রসারণে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের জমির ওপর সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্মাণকাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ওরিয়া কনস্ট্রাকশনের কর্ণধার সাইফুর রহমান বলেন, প্রকল্প অনুযায়ীই সড়কের কাজ করা হয়েছে এবং স্থানীয় মানুষের চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় রেখেই কিছু অংশে রাস্তার প্রস্থ বাড়ানো হয়েছে।
শ্রীনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মহিফুল ইসলাম বলেন, “শুধু আদিলুর রহমান খানের বাড়ির সামনে নয়, পুরো সংযোগ সড়কটিই সংকীর্ণ ছিল। তাই সেটি প্রশস্ত করা হয়েছে, যাতে এলাকাবাসী স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন।”
এদিকে সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের এক বাল্যবন্ধুকে সুবিধা দিতে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে স্থানীয়রা জানান, ওই ব্রিজ দিয়ে আশপাশের প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করছেন এবং এতে তারা উপকৃত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, সড়কটি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমিয়েছে। তবে অন্যদিকে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।