রাজধানীর রূপনগরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিভে গেল ১৮ বছর বয়সী তরুণী মার্জিয়া সুলতানা আলোর জীবন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শিয়ালবাড়ি এলাকার চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত ‘আরিয়ান ফ্যাশন’ পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান অন্তত ১৬ জন শ্রমিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আলো ও তার স্বামী মো. জয়ও, যাদের বিয়ে হয়েছিল মাত্র তিন মাস আগে।
দগ্ধ শ্রমিকদের স্বজনরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর আলো শেষবার বাবাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
“কারখানায় আগুন লেগেছে, আমরা আটকে গেছি, বের হতে পারছি না।” এরপরও ফোনে কল বাজলেও আর কোনো সাড়া মেলেনি। কিছুক্ষণ পর থেকেই ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পাশের পোশাক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ১২টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চালায়। বিকেলে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে।
মরদেহ শনাক্তের জন্য নিহতদের স্বজনরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করেছেন। হাসপাতালের মর্গের সামনে আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিহতদের অনেকেই নারী শ্রমিক, যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন।
জয়ের মা শিউলী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ভালো থাকার আশায় ছেলে এই কারখানায় কাজ নিয়েছিল। এখন ছেলে-বউ দুজনকেই খুঁজে পাচ্ছি না।”
মুন্নী আক্তার নামের আরেক শ্রমিকও নিখোঁজ রয়েছেন। তার শ্বাশুড়ি তাহেরা বেগম বলেন, “সকালে নাশতা খেয়ে কাজে গিয়েছিল, এখন আর খোঁজ পাচ্ছি না।”
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কেমিক্যাল গোডাউন থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। গোডাউনের দাহ্য পদার্থে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
এদিকে, এলাকাবাসীর দাবি— পোশাক কারখানাটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়, যা হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়েছে।
দুপুরের পর থেকেই পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা অভিযোগ করেন, পুরনো ভবনটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমন পথও ছিল না।
রাত সোয়া ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দেশজুড়ে এই দুর্ঘটনা গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। নিরাপত্তাহীন পোশাক কারখানা, দাহ্য পদার্থের অবাধ ব্যবহার এবং মানবিক অবহেলার এই নির্মম উদাহরণ আবারও প্রমাণ করল— বাংলাদেশের শিল্পখাত এখনো শ্রমিকজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।