ব্রিটেনে জেফরি এপস্টাইন কেলেঙ্কারির বিস্তার আবারও পশ্চিমা রাজনীতি, রাজতন্ত্র ও অভিজাত শ্রেণির নৈতিকতার মুখোশ খুলে দিয়েছে। মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার বুলি আওড়ানো পশ্চিমা শক্তিগুলো আসলে কোন পথে হাঁটছে—এই প্রশ্ন নতুন করে জনমতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার নথিতে দেখা যাচ্ছে, যৌন অপরাধে দণ্ডিত জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও প্রভাবশালী অভিজাতদের সম্পর্ক শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা এক গভীর নৈতিক স্খলনের প্রতিচ্ছবি।
নথিগুলোতে ইয়র্কের ডিউক হিসেবে পরিচিত প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং তার সাবেক স্ত্রী সারা ফার্গুসনের নাম স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এসব দলিল বলছে, এপস্টাইনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও দণ্ডের পরও তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। শুধু রাজপরিবারই নয়, ব্যবসা ও মিডিয়ার দুনিয়ার প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এই নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন। ব্রিটিশ ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসনের নাম নথিতে শত শতবার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা পশ্চিমা অভিজাতদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত করেছে।
২০১৩ সালের এক ইমেইল আদান-প্রদানে ব্র্যানসন এপস্টাইনকে লিখেছিলেন, তার সঙ্গে দেখা করা “সত্যিই ভালো” ছিল এবং তিনি ভবিষ্যতেও দেখা করতে আগ্রহী, এমনকি কটাক্ষপূর্ণ ভাষায় ‘হারেম’ নিয়ে আসার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত রুচির পরিচয় নয়, বরং ক্ষমতা ও প্রভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ। এতে স্পষ্ট হয়, এপস্টাইন কেলেঙ্কারি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধচক্র নয়, বরং পশ্চিমা অভিজাত সমাজের গভীরে প্রোথিত এক নৈতিক রোগ।
লন্ডন, ওয়াশিংটনসহ পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে যা ঘটছে, তা কয়েক দশক ধরে তৈরি করা নৈতিক ভান ও শ্রেষ্ঠত্বের মুখোশ ছিঁড়ে দিয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা নিজেকে বরাবরই দুর্নীতি, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ধরনের কেলেঙ্কারি সেই সব প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রস্থলেই ঘটছে, যারা একসময় বিশ্বকে নৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার দাবি করত।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইউরোপের রাজদরবার থেকে শুরু করে গির্জা, রাজনীতি ও বিনোদন জগতে নৈতিক ও যৌন কেলেঙ্কারির অভাব কখনোই ছিল না। প্রশ্নটা তাই এই নয় যে পশ্চিমাদের নৈতিক স্খলনের ইতিহাস আছে কি না, বরং কেন এই মুহূর্তে এত বড় পরিসরে এই সত্যগুলো সামনে আসছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এপস্টাইন কেলেঙ্কারি অভিজাত শ্রেণির পতনের প্রতীক, যারা সম্পদ, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে দীর্ঘদিন নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ভেবেছে।
ইউরোপের বিভিন্ন থিঙ্কট্যাংক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কেলেঙ্কারি ঘোষিত মূল্যবোধ আর বাস্তব আচরণের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যবধানকে উন্মোচিত করেছে। পশ্চিমারা মুখে স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার কথা বললেও, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে জবাবদিহির প্রক্রিয়া ধীর, অস্পষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সতর্কতা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘসূত্রতা এই দ্বিচারিতার স্পষ্ট উদাহরণ।
এই কেলেঙ্কারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পশ্চিমাদের নৈতিক কর্তৃত্বের পতনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই ঘটনাগুলো কি একটি যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করছে—যে যুগে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেকে নীতি ও আইনের একমাত্র আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছিল। সমালোচক সংবাদমাধ্যমগুলো সতর্ক করে বলছে, প্রকৃত সংস্কার ছাড়া এসব প্রকাশ অভিজাতদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে।
শেষ পর্যন্ত, এপস্টাইন কেলেঙ্কারি দেখিয়ে দেয় পশ্চিমা বিশ্ব নতুন কোনো বাস্তবতার মুখোমুখি হয়নি, বরং তার ইতিহাসের চাপা পড়ে থাকা স্তরগুলো উন্মোচিত হচ্ছে। “পশ্চিমারা কোথায় যাচ্ছে” প্রশ্নটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি গভীর নৈতিক প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। এর উত্তর নির্ভর করবে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে নিজেদের অতীত ও বর্তমানের মুখোমুখি হতে কতটা প্রস্তুত তার ওপর।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?