চব্বিশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর কুটনৈতিক সুনামকে কাজে লাগিয়ে এ দেশের মসৃণ এ পরিবর্তনের গতিশীলতাকে সামলে যাচ্ছেন নিপুণভাবে।
তিনি তাঁর ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কূটনীতি দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে উন্মোচন করেছেন এক নতুন দিগন্ত ।
বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি’, যেখানে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, সবদিকেই ছড়িয়েছে তাঁর কুটনৈতিক উদ্যোগ।
আগের ভারতকেন্দ্রিক বৈদেশিক নীতির ধারা থেকে সরে এসে ইউনূস প্রশাসন আস্থা ও নিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে গড়ে তুলছে নতুন এক কুটনৈতিক বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের পর নতুন কোনো প্রশাসনের জন্য বৈদেশিক নীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে চ্যালেঞ্জিং। কারণ, তাঁর সময়কালের কুটনৈতিক কাঠামো ছিল প্রবলভাবে ভারত নির্ভর।
কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস সেই আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে তাঁর বৈশ্বিক খ্যাতি ও কুটনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে মসৃণ পরিবর্তনশীলতাকে সামলিয়ে পররাষ্ট্রনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছেন।
গত ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ড. ইউনূস দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের কুটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। এর লক্ষ্য ছিল, দেশের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল রূপান্তর এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অঙ্গনে নতুন করে দৃঢ় অবস্থানে দাঁড় করানো।
বৃহত্তর এই কুটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে কাল বুধবার সকালে চারদিনের জাপান সফরে যাচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে তিনি টোকিওতে অনুষ্ঠেয় ৩০তম নিক্কেই ফোরামে অংশ নেবেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।
অধ্যাপক ইউনূসের চীন সফরে যাওয়ার আগেই জাপান সফরসূচি ঠিক করা হয়েছিল। এমনটি করা হয়েছে, যাতে বোঝানো যায়, বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব বেড়ে গেলেও তাঁর সরকার সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে কূটনীতি করতে চায়।
দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং কৌশলগতভাবে পুনর্বিন্যস্ত বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, ড. ইউনূসের পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গঠনমূলক এবং স্বাধীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায়।
বাইডেন থেকে শি জিনপিং, শি থেকে মোদি, আঞ্চলিক রাজধানী থেকে আন্তর্জাতিক ফোরাম সব দিকেই ইউনূসের কূটনীতির হাত প্রসারিত হয়েছে। ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি’ বলতে বোঝানো হয় একটি পূর্ণাঙ্গ, সামগ্রিক ও সুষম পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে প্রতিটি দিক বিবেচনায় রাখা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বহুমুখী কূটনীতি বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকে নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশাপাশি নতুন জোটও গড়ে তোলা হচ্ছে। যার লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে জাতীয় স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।