সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
বৃহত্তর রংপুর বিভাগে, বিশেষ করে লালমনিরহাট জেলায় তামাক চাষে এক ভয়াবহ বিপ্লব ঘটেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে তামাকের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের এই ক্ষতিকর চাষের দিকে উন্মাদের মতো ধাবিত করছে। কৃষি বিভাগের শত চেষ্টা আর তামাক বিরোধী আন্দোলনের তোড়জোড় ছাপিয়ে মাঠের পর মাঠ এখন তামাকের দখলে। ফলে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রংপুর অঞ্চলে উৎপাদিত মোট তামাকের প্রায় ৭০ শতাংশই উৎপাদিত হয় লালমনিরহাট জেলায়। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দেখলে এর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। বিগত কয়েক বছরে লালমনিরহাটে তামাক চাষ ও এর মূল্য জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ২০২২ সালে ১৮,৫০০ হেক্টরে চাষ হওয়া তামাকের মণ ছিল ৬,০০০ টাকা, যা ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে বর্তমানে (২০২৫-২৬) ২৫,০০০ হেক্টর ছাড়িয়েছে এবং বাজারমূল্য ঠেকেছে রেকর্ড ১৩,০০০ টাকায়। মূলত প্রতি বছর অস্বাভাবিক মুনাফা ও কোম্পানির প্রলোভনে কৃষকরা খাদ্যশস্য বাদ দিয়ে তামাক চাষে ঝুঁকছেন।
গত মৌসুমে তামাকের বাজারমূল্য কৃষকদের কল্পনার বাইরে চলে গিয়েছিল। লালমনিরহাটের কৃষক আনোয়ার পাশা জানান, “আগে তামাকের দাম প্রতি মণে ৬,০০০ টাকার আশেপাশে থাকত। কিন্তু এবার আমরা তামাক বিক্রি করেছি ১৩,০০০ টাকা পর্যন্ত।”
আরেক কৃষক আসিফ উদ্দিন (৫৫) জানান, গত বছর ৪ বিঘা জমিতে চাষ করে অভাবনীয় লাভ পাওয়ায় এ বছর তিনি চাষের পরিধি আরও বাড়িয়েছেন। তার মতে, অন্য কোনো ফসলে এতো অল্প সময়ে এতো বেশি লাভ করা সম্ভব নয়। এই অধিক মুনাফার লোভেই কৃষকরা ধান বা সবজি চাষ বাদ দিয়ে তামাকের দিকে ঝুঁকছেন।
বেসরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে অন্তত ৭টি বড় তামাক কোম্পানি সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়। তারা কৃষকদের কেবল উৎসাহই দিচ্ছে না, বরং দিচ্ছে নানাবিধ প্রলোভন সুদমুক্ত ঋণ চাষের শুরুতে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ, বিনামূল্যে উপকরণ সার, বিষ ও কীটনাশক সরবরাহ, নিশ্চিত বাজার ফসল ওঠার পর বিক্রির নিশ্চয়তা।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মোঃ সাইখুল আরিফিন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “সুনির্দিষ্ট আইনি বিধি-নিষেধ না থাকায় তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা কেবল সচেতনতা বাড়াতে পারি, কিন্তু লাভের অংক যখন দ্বিগুণ হয়, তখন সচেতনতা খুব একটা কাজে আসে না।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে “আমাদের তামাক নয়, বরং খাদ্যের প্রয়োজন। তামাক চাষ কেবল স্বাস্থ্যই নয়, বরং মাটির উর্বরতা ও খাদ্য নিরাপত্তাকেও সরাসরি ধ্বংস করছে।”
তামাক বিরোধী সংগঠনগুলোর (PROGGA, WBB Trust) মতে, তামাক কোম্পানিগুলোর ঋণের প্রলোভন ও সাময়িক মুনাফার লোভে পড়ে কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হচ্ছে, বন উজাড় হচ্ছে এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গিয়ে চরম খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মূলত তামাক চাষ কেবল জনস্বাস্থ্যই নয়, বরং আমাদের মাটি ও পরিবেশকেও বিষাক্ত করে তুলছে।
তামাক চাষ কেবল বর্তমানের খাদ্য উৎপাদনই কমাচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের মাটিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে। তামাকের শিকড় মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত গিয়ে পুষ্টি শোষণ করে। এছাড়া উর্বরতা হ্রাস তামাকের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, তামাক পাতা শুকানোর জন্য বনের কাঠ পোড়ানো হচ্ছে, যা বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে, চাষি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা (বিশেষ করে শিশুরা) ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ সহ শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
তামাক কোম্পানির আগ্রাসন আর নগদ মুনাফার লোভে কৃষকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করে কোম্পানির ঋণের বিকল্প হিসেবে সরকারি কৃষি ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করলে, লালমনিরহাটসহ পুরো উত্তরবঙ্গ এক সময় শস্যভাণ্ডারের পরিবর্তে বিষের ভাণ্ডারে পরিণত হবে।