ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ব্রীজের কোটি টাকা আত্মসাত অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের বালু ও রড দিয়ে চলছে কাজ, তদারকির নামে প্রহসন, থেমে নেই নকশা বাণিজ্য।
ব্রীজের কাজের সময় শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলেও, হয়নি মামলা। বিশ্বব্যাংকের ৪ কোটি টাকার এ প্রকল্পে সময় বাড়লেও বাড়ছেনা কাজের গতি, দুর্নীতিতে জড়িত প্রকৌশলীরাও।
ধারাবাহিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার কামারগাঁও ইউনিয়নের চংনাপাড়ায় নির্মাণাধীন পিসি গার্ডার ব্রিজ এখন স্থানীয়দের কাছে উন্নয়ন নয়, দুর্নীতির রাজসাক্ষী। সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এলজিইডির অধীনে ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রণু তালুকদারের বিরুদ্ধে নকশা পরিবর্তন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, কাজের অস্বাভাবিক ধীরগতি ও সংযোগ সড়ক ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্রিজ চালুর ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেনের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সূত্র জানায়, ৩৫ মিট ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে এখন সালের ডিসেম্বর করা হয়েছে। সময় বাড়লেও কাজের গতি বাড়েনি। উল্টো প্রকল্পের নকশাই বদলে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নকশা অনুযায়ী ব্রিজটি সোজা হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ১২ ফুট উত্তর দিকে বাঁকিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। সংযোগ সড়কও বাঁকা করে তৈরি করা হচ্ছে। এতে ব্রিজে উঠা-নামা এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
চংনাপাড়া গ্রামের নিয়ামুল কবীর জানান, ব্রিজটি সোজা না হয়ে বাঁকা হওয়ায় গাড়ি উঠানামা ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দোকানঘর ও পাশ্ববর্তী স্থাপনাও ঝুঁকির মুখে।
চংনাপাড়ার শামসুল হকের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর থেকে একটি প্রভাবশালী মহল এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। স্থানীয় বিরোধের জেরে অর্থের বিনিময়ে ব্রিজের নকশা পরিবর্তন করানো হয়েছে। এলাকাবাসী এটিকে পরিকল্পিত নকশা বাণিজ্য বলেই দেখছে।
নিম্নমানের বালু ও রড ব্যবহারের অভিযোগে চংনাপাড়ার হাবিবুর রহমান সাবেক ইউএনও জাকির হোসেনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পর বালু পরিবর্তন হলেও পুরো প্রকল্পজুড়ে তদারকি ছিল প্রায় অদৃশ্য। ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতি ছিল কেবল ঢালাইয়ের দিন।
ব্রিজ নির্মাণকালে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে সুনামগঞ্জের হৃদয় নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও কাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়নি বা হয়নি কোন মামলা। বরং কাজ আরও ধীর হয়ে পড়ে।
ঠিকাদার রণু তালুকদার নিজেই স্বীকার করেছেন যে শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে “ম্যানেজ” করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত তিন কোটি টাকার বিল তোলা হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী জোবায়ের হোসেন দাবি করেন, বৃষ্টিতে ডাইভারশন ভেঙে যাওয়া ও শ্রমিকের মৃত্যুর কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে এবং ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অনিয়ম, নকশা কারসাজি, নিম্নমানের উপকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল ও নির্মাণ বিলম্ব সব মিলিয়ে চংনাপাড়ার এই ব্রিজ এখন দুর্নীতির উন্মুক্ত প্রদর্শনী। স্থানীয়রা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চান