বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে চটেছে নয়াদিল্লি। ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে তার সাহসী ও বাস্তবমুখী পর্যবেক্ষণ, যা ভারতের বহুপ্রচারিত আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
চীন সফরে বক্তব্য প্রদানকালে ড. ইউনূস বলেন, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স—আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ ও মেঘালয়—সম্পূর্ণরূপে স্থলবেষ্টিত, যাদের কোনো সমুদ্রপথ নেই। সমুদ্রের প্রবেশাধিকার শুধুই বাংলাদেশের মাধ্যমেই সম্ভব।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, “আমরাই এই অঞ্চলের একমাত্র সমুদ্র অভিভাবক।”
এই বক্তব্য যেন ভারতের দীর্ঘদিনের ‘বিগ ব্রাদার সিন্ড্রোম’-এ সজোরে আঘাত করে। সাথে সাথে তা গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকদের মাধ্যমে হুমকির সুরে প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ভিনা সিক্রি এক বিবৃতিতে বলেন, “তিনি (ইউনূস) এমন মন্তব্য করার অধিকার রাখেন না।” তার এই ‘অত্যন্ত অদ্ভুত’ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অস্বীকারের মতো ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছেন।
ভিনা সিক্রির হুমকির সুর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি বলেন, “যদি বাংলাদেশ উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহযোগিতা না করে, তাহলে তারা নিজেও কোনো জলপথ দাবি করতে পারবে না।” এই বক্তব্য ভারতের পুরোনো ঔপনিবেশিক মনোভাবের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়।
তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য ভারতের প্রতি সরাসরি এক রাজনৈতিক বার্তা—ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান কোনো করুণা নয়, এটি একটি কৌশলগত বাস্তবতা। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর নীরব প্রতিবেশী নয়; বরং একটি স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।
ড. ইউনূসের এই বক্তব্য মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের ভূগোল এখন ‘গেইটওয়ে’ নয়, বরং ‘গেইটকিপার’। উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন, নিরাপত্তা কিংবা কৌশলগত প্রবেশাধিকার—সবই বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে অসম্ভব।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বক্তব্য শুধু এক ব্যক্তির মত নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকায় এক নতুন আস্থার ঘোষণা। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগে মুখর দিল্লি আদতে বুঝে গিয়েছে—ঢাকা এখন আর একতরফা আশ্বাসে বিশ্বাস করে না, বরং কৌশলগত সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের পথে হাঁটে।
এই বাস্তবতা ভারতের কূটনীতিকে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করবে। আর বাংলাদেশ, সেই ‘অভিভাবকত্ব’ এখন কেবলই ভৌগোলিক নয়—রাজনৈতিক অবস্থানেও।