সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের ভোট কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
১৫ বছরেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনী মাঠে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোটও এবার শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং তারা ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল অর্জন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনের সময় বিরোধী দলগুলো রাজপথে সক্রিয় থাকতে পারেনি। কখনো নির্বাচন বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে তারা কার্যত মাঠের বাইরে ছিল। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
রয়টার্স জানায়, এবারের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হবে বলে ‘ব্যাপকভাবে ধারণা’ করা হচ্ছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেন, তার দল সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে এবং সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পাবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট বিএনপিকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এ জোটের সঙ্গে ৩০ বছরের কম বয়সী জেনারেশন জেড কর্মীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দলও যুক্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে যদি স্পষ্ট রায় আসে, তাহলে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতায় তৈরি পোশাক খাতসহ বড় শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ–এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনও বিপুলসংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন। তিনি বলেন, ফল নির্ধারণে জেনারেশন জেডের ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এই প্রজন্মের।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার ও ব্যানার চোখে পড়ছে, যা আগের নির্বাচনের চিত্রের সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। অতীতে যেখানে সর্বত্র আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের আধিপত্য ছিল, এবার সেখানে ভিন্ন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে, যদিও এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা কম। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আগ্রহের মূল কারণ ধর্মীয় অবস্থান নয়, বরং তাদের ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’। জরিপে দেখা গেছে, ভোটাররা দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন।
আঞ্চলিক কূটনীতির বিষয়ে রয়টার্স জানায়, ভারতের প্রভাব কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে তুলনামূলকভাবে দিল্লির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে দেশটি পাকিস্তানের দিকে আরও ঝুঁকতে পারে বলেও মত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকেই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে গেলে দলটির চেয়ারম্যান ডা. শফিকুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।