ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজি বিষয়ে বিদেশে অর্জিত ডিগ্রি নিয়ে চলমান বিতর্ককে কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রখ্যাত বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. মৃণাল কুমার সরকার। তার মতে, এটি মূলত আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রস্তুতির ঘাটতির প্রতিফলন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) কর্তৃক ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজি ডিগ্রি নিয়ে শোকজ নোটিশ জারির পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এ প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এভারকেয়ার ফার্টিলিটি সেন্টার-এর কো-অর্ডিনেটর ডা. মৃণাল কুমার সরকার, যিনি বাংলাদেশে আইভিএফ ও এআরটি চিকিৎসা পদ্ধতির অন্যতম অগ্রদূত।
ডা. মৃণাল কুমার সরকার বলেন, ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ও ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত মেডিকেল সাবস্পেশালিটি। অথচ বাংলাদেশে এই ডিগ্রিকে ‘অজানা’ হিসেবে বিবেচনা করাই মূল বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, “সমস্যার মূল জায়গা ছিল—বিএমডিসি তখন এই ডিগ্রিটির সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে পরিচিত ছিল না। তারা জানতে চেয়েছিল, এটি কী ধরনের ডিগ্রি এবং এর কাজের পরিধি কী।”
তিনি বলেন, বিষয়টি তুলনামূলকভাবে নতুন হওয়ায় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এটি বিদ্যমান কাঠামোর কোন ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পাবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব ছিল। তবে ডিগ্রিটির স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ডা. মৃণাল কুমার সরকার বলেন, অধ্যাপক টি. এ. চৌধুরী এবং অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর মাধ্যমে বিএমডিসিতে বিষয়টি স্বীকৃত করার চেষ্টা করা হয়।
এমনকি ডা. খালিদুজ্জামানকে কোনো পদে পদায়নের আগেই ডিগ্রিটিকে বিএমডিসির আওতায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অপরিচিত হওয়ায় নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষ।
তার মতে, এটি কোনো একক ব্যক্তিকে ঘিরে সৃষ্ট সমস্যা নয়; বরং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির তুলনায় দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রস্তুতির ঘাটতির একটি উদাহরণ। তিনি বলেন, “ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজি বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি সাবস্পেশালিটি হলেও আমাদের দেশে এটিকে ‘আননোন’ হিসেবে দেখা হয়েছে—এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
ডা. মৃণাল কুমার সরকার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বে প্রচলিত ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা শাখাগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হতে পারে। তার মতে, কোনো ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেটি যাচাই করে নীতিগত সমাধানের পথ খোঁজা উচিত ছিল। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি না বুঝেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক ও উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের আপডেটেড দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে।
শেষে ডা. মৃণাল কুমার সরকার আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এ ধরনের বিশেষায়িত শাখা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্পষ্টতা আসবে। যোগ্য ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত হলে এসব ডিগ্রির প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহারিক গুরুত্ব বোঝানো সহজ হবে এবং এ ধরনের বিভ্রান্তির পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না।