আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নিতে বেশ আগেই শতাধিক আসন ছাড়ার প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ১০ দলীয় (প্রক্রিয়াধীন ১১ দলীয়) নির্বাচনি সমঝোতার ঘোষণা দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্তের প্রতিফলন দেখা যায়—কয়েকটি আসনে দলটি মনোনয়নপত্র জমা দেয়নি। সমঝোতা চূড়ান্ত হলে আরও আসন ছাড়ার সিদ্ধান্তও রয়েছে। তবে এর মধ্যেই সম্ভাবনাময় অনেক আসন ছেড়ে দেওয়ায় দলটির তৃণমূল নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনি জোটের স্বার্থে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র না দিলেও দীর্ঘদিনের গণসংযোগ, মাঠপর্যায়ের তৎপরতা ও আবেগঘন স্মৃতির কথা তুলে ধরছেন অনেকেই। ছেড়ে দেওয়া আসনে প্রার্থীদের জন্য শুভকামনা জানালেও মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান উঠছে তৃণমূলে।
এদিকে প্রত্যাশামতো আসন নিশ্চিত না হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শেষদিনের আগে সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় অনেক দল বাড়তি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়, যা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়। সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনাও চলছে। দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানালেও জামায়াত মনে করছে, আলোচনায় বসলে জটিলতা কাটবে।
মনোনয়নপত্র জমার শেষদিনের আগে গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে ১০ দলীয় নির্বাচনি সমঝোতার ঘোষণা দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে আগে থেকে আন্দোলনরত আট দলের সঙ্গে যুক্ত হয় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্য শরিকদের মধ্যে রয়েছে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। পরদিন অনানুষ্ঠানিকভাবে এবি পার্টি যুক্ত হয়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির বলেন, এটি জোটের চেয়েও শক্ত একটি নির্বাচনি সমঝোতা; আসন বণ্টন প্রায় সম্পন্ন, বাকি বিষয়গুলো মনোনয়ন জমার পর সমাধান হবে।
সূত্র জানায়, মনোনয়ন জমার শেষ দিনে ১১ দল মিলে ৩০০ আসনে সাত শতাধিক প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ২৭৬, ইসলামী আন্দোলন ২৭২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯০, খেলাফত মজলিস ৬৭, এনসিপি ৪৭ ও এলডিপি প্রায় ২৫টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। সমঝোতার কিছু আসনে একক প্রার্থী থাকলেও বহু জায়গায় একাধিক দলের প্রার্থী রয়েছে।
মনোনয়ন জমার পরদিনই আসন সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম। দলটির দাবি, তারা ১৪৩টি আসনে ‘এ-ক্যাটাগরি’। এ নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষাপটে প্রেস ব্রিফিং আহ্বান করা হলেও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে তা স্থগিত হয়। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, আসন সমাধানে তারা সন্তুষ্ট নন বলেই ২৭২টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন। আলোচনার পথ খোলা থাকলেও সন্তোষজনক সমাধান না হলে আলাদাভাবে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান তিনি।
এদিকে ইসলামী আন্দোলনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-এর তৃণমূলে অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানা গেছে। সম্ভাবনাময় আসন ছাড়ার পাশাপাশি জোটের কিছু শরিকের বিতর্কিত মন্তব্যের সমালোচনাও করছেন তারা। ভোটের বাস্তবতা বিবেচনা না করে অবাস্তব দাবি তোলার অভিযোগ উঠেছে।
‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলের পোস্টে বলা হয়, ১১ দলীয় জোটে জামায়াতের তথাকথিত ‘গ্রিন সিট’ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। গত পাঁচ বছরে সংগঠনটি অন্তত ৭০টি আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও সেসব আসনে ছোট দলগুলোর দাবি চাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে জামায়াতের মিডিয়া সেল এক ফেসবুক পোস্টে বলেছে, জোটের বৃহত্তর স্বার্থে প্রার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিশ্চিত আসন ছেড়ে দিয়ে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন—ক্ষমতার চেয়ে আদর্শই তাদের চালিকাশক্তি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানান, ঐক্য অটুট রাখতে সম্মানজনক আসন বণ্টনের জন্য দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল জলিল বলেন, আলোচনা চলমান রয়েছে এবং মনোনয়ন বাছাইয়ের পর সমাধান হবে বলে তারা আশাবাদী।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর বড় কোনো সমস্যা নেই; আলোচনায় বসলে সব জটিলতারই সমাধান হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।