জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) বেলা ২টা ৫০ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনাল জানায়, শেখ হাসিনাসহ তিনজনের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “শেখ হাসিনার যে বিচার হয়েছে তা অপরাধের তুলনায় যথেষ্ট নয়, কিন্তু এটি শুধু অতীতের বিচার নয় বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা।” তিনি আরও বলেন, “এ বিচার অপরাধের তুলনায় যথেষ্ট নয়। কিন্তু এটা শুধু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়, সামনের দিনের জন্য উদাহরণ। যাতে কেউ আর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র না হয়, কেউ যাতে ফ্যাসিস্ট না হয়ে ওঠে।”
তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার যত শক্তিশালীই হোক, বা যতদিন ক্ষমতায় থাকুক, একদিন না একদিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। এটি একটি মাইলফলক।” উল্লেখ্য, সালাহউদ্দিন আহমদ শেখ হাসিনার শাসনামলে গুমের শিকার হয়েছিলেন এবং তাকে ঢাকা থেকে তুলে ভারতের শিলংয়ে ফেলে রাখা হয়।
রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধারা আদালত প্রাঙ্গণে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অনেকে স্লোগান দেন, পরে অ্যাটর্নি জেনারেল সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য শেখ হাসিনার আমলে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সেটি পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা (মিসকেস) রুজু হয়।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয় এবং ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। প্রথমে তিনি একমাত্র আসামি ছিলেন, পরে এ বছরের মার্চে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে আসামি করতে প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
মামলায় পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়—
১. উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া।
২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে আন্দোলন দমন ও হত্যার নির্দেশ।
৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যার অভিযোগ।
৪. চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ।
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ।
মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দেন—আন্দোলনকারী, আহত ব্যক্তি, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসকসহ। উপস্থাপিত হয় অডিও, ভিডিও, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং জব্দকৃত গুলি।
১২ অক্টোবর যুক্তি–তর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৩ অক্টোবর। ওই দিন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।
রায়কে ঘিরে ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকে। রোববার থেকেই দোয়েল চত্বর হয়ে শিক্ষাভবনমুখী সড়ক বন্ধ রাখা হয় এবং জনসাধারণের চলাচল সীমিত করা হয়।