জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ চারটি দল আবারও একযোগে ১২ দিনের অভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে নিয়ে ওই কর্মসূচি আগামী ১ অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন গণসংযোগ, গণমিছিল ও স্মারকলিপি প্রদানসহ ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আকারে চলবে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচির খুঁটিনাটি উপস্থাপন করা হয় এবং নেতারা দৃঢ়ভাবে বলেন, জনগণের দাবি বাস্তবায়ন না করলে আন্দোলন থামবে না।
সংগঠিত কর্মসূচির মধ্যে ১ থেকে ৯ অক্টোবর পাঁচ দফা দাবির পক্ষে জনমত গড়ার লক্ষ্যে গণসংযোগ থাকবে; ১০ অক্টোবর ঢাকা এবং বিভাগীয় শহরে একযোগে গণমিছিল, এবং ১২ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান রয়েছে। পাশাপাশি মতবিনিময় সভা, গোলটেবিল বৈঠক ও সেমিনারের আয়োজনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। দলের নেতারা উল্লেখ করেছেন, আগের মাসে তিন দিনের কর্মসূচিই পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল—তাই এবার আরও বড় স্তরে আন্দোলন তীব্র করা হবে।
মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরেই জুলাই সনদকে আইনগত ভিত্তি দেওয়ার কার্যক্রমে জোর দিয়েছে। ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’কে উদাহরণ হিসেবে টেনে তারা দাবি করছেন, অতীতের নানা নজিরকে সামনে রেখে জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। জটিলতা এড়াতে জামায়াত ইতোমধ্যে সরকারের কাছে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামতাবলম্বে দুটি প্রস্তাবও পাঠিয়েছে—প্রথমটি ‘সংবিধান আদেশ’ জারি করে জুলাই জাতীয় সনদের বিধিগুলো নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়টি নির্বাচনের আগে গণভোট করিয়ে জুলাই সনদকে অধিক আইনি ভিত্তি দেওয়া। তাদের বিবেচনায়, যদি এসব না করা হয় তবে ছাত্র-জনতার রক্তে অর্জিত অভ্যুত্থানের অর্জন সংগ্রহশূন্য হয়ে পড়বে।
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আবদুর রহমান মূসা প্রমুখ—যারা সকলেই দাবি করেন, ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার তৎপর না হলে জনগণের অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
পুরনো পল্টনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মাহসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ একই ধারার বক্তব্য তুলে ধরেন; তিনি বলেন, ধারাবাহিক কর্মসূচি ও সংলাপ সত্ত্বেও সরকারের অংশগ্রহণ বা ইতিবাচক সাড়া নেই, যা জনগণের রক্তে প্রতিষ্ঠিত সরকারের নৈতিক ও আইনগত বৈধতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। খেলাফত মজলিস তাদের বিবৃতিতে দেশের ‘ভয়াবহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট’ সম্পর্কে সতর্ক করে জানান, জুলাই সনদের বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা থাকায় জাতি আজ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হচ্ছে—তারা দাবি করেন, পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরায় চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। একই সঙ্গে জাগপা ৭ দফার নিজেদের দাবি সম্বল করে সমন্বিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং দলটির কর্মকর্তারা মিটিংয়ে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছেন।
এভাবে আন্দোলন ফের সড়কে নামার ঘোষণাই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার বওয়া শুরু করেছে; বিশেষত যখন দাবি-দাওয়া কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে আয়োজন করার দাবি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, গণহত্যার বিচারের দৃশ্যমানতা ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নির্দিষ্ট দলগুলোর (জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলের কিছু অংশ) কার্যক্রমের ওপর নিহতার বিধানসহ বিচারাভিযান চালানো। এগুলো বাস্তবায়ন না হলে রাজনীতির মঞ্চে কেবলই উত্তেজনা বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
নেতাদের হুঁশিয়ারি—সরকার যদি জনগণের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে, তবে সুশৃঙ্খল হলেও বৃহৎ স্তরে ধারাবাহিক আন্দোলন তীব্র হবে; এবং কেবল কথায় নয়, মাঠের গণযোগাযোগ ও সুশৃঙ্খল কর্মসূচির মাধ্যমে তারা তাদের দাবি বাস্তবায়ন করানোর সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আগামী দুই সপ্তাহে যে জনজমায়েত ও মিছিল-সমাবেশগুলো হবে সেগুলো ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে এবং তা ছাড়া ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ারও প্রবল শঙ্কা রয়েছে।