ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ছাত্রদল ঘোষিত ৫৯৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। প্রকাশিত কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, এমনকি ১৫ জুলাইয়ের ছাত্রনির্যাতন ও হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। এমন বিতর্কিত অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের ভেতরেই শুরু হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রশ্নের ঝড়।
কমিটিতে নাম আসা বেশ কয়েকজনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় রীতিমতো আতঙ্কজনক। উদাহরণস্বরূপ, ড. শহীদুল্লাহ হলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিবুল হাসান সৌরভ একসময় ছিলেন ঢাবির জীববিজ্ঞান অনুষদের ছাত্রলীগ নেতা। রোকেয়া হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নিতু রানী সাহা ছিলেন ছাত্রলীগের উপ-গণযোগাযোগ সম্পাদক, যিনি কেবল পদত্যাগ করেন আন্দোলনের চাপে পড়ে।
আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো—বিজয় একাত্তর হলের যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন সেই রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নিবিড় খান লোহানী, যাদের বিরুদ্ধে গেস্টরুম নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের মাহমুদ হাসান, যিনি ‘প্রলয় গ্যাং’-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত এবং শিক্ষার্থীদের বয়কটের শিকার হয়েছিলেন, তাকেও জায়গা দেওয়া হয়েছে ছাত্রদলে।
ছাত্রলীগের অনুসারী হিসেবে পরিচিত জান্নাতুল ফেরদৌস পুতুল এখন কুয়েত-মৈত্রী হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব। একইভাবে আরও বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ ঘনিষ্ঠকে ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এমন নজিরবিহীন অনুপ্রবেশে প্রশ্ন উঠেছে—ছাত্রদল আজ কার হাতে, কার জন্য?
বিতর্কের মুখে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। ঢাবি ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনকে এই কমিটিতে রাখা হয়েছে। তাদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেছেন,
“আবেদনপত্রের ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো তথ্য গোপন করেছে, তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, ছাত্রদলের হলভিত্তিক কমিটি ঘোষণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ। তারা মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ তোলে,
“অভ্যুত্থানের পরপরই হল ও একাডেমিক এলাকায় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে শিক্ষার্থীদের মতামত ছিল। কিন্তু প্রথমে শিবির, পরে ছাত্র ইউনিয়ন, এখন ছাত্রদল—এক এক করে সবাই সেই শিক্ষার্থীস্বপ্নের প্রতি কুঠারাঘাত করেছে।”
এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের ‘আহ্বায়ক কমিটি’ আদতে কি রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়ে উঠছে? নাকি ছাত্রদলের ভেতরে শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রণ হারানোর এক অস্থির প্রক্রিয়া?
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল মুক্ত হল-পরিবেশ, ক্লিন ক্যাম্পাস এবং রক্ত ও নির্যাতনহীন রাজনীতি। অথচ ছাত্রদলের নামে যেভাবে ছাত্রলীগ ও বিতর্কিত ব্যক্তিরা ঢুকে পড়ছে, তাতে করে আগামীতে রাজনীতির স্বচ্ছতা নিয়েই তৈরি হয়েছে এক বড় শঙ্কা।