সংস্কারের নামে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র বিএনপি কখনোই সমর্থন করে না—রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এমন সাফ বার্তা দিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রোববার (৬ জুলাই) বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন,
“সংস্কার নিয়ে কিছু দল কথা বলছে। সংস্কার বিষয়ে বিএনপির আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের নামে দুর্বল করার প্রস্তাবকে বিএনপি সমর্থন করে না।”
সম্প্রতি রাজনৈতিক মহলে ‘সংস্কার-ভিত্তিক ঐকমত্য কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে বিএনপিকে কৌশলে কোণঠাসা করার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
“একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের পর, আবারও নতুন করে প্রস্তাব দিয়ে সংস্কারকে বিলম্বিত করা হচ্ছে।”
সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—এই বক্তব্যের লক্ষ্য সম্ভবত সেইসব নতুন রাজনৈতিক জোট বা ব্যক্তিরা, যারা নির্বাচন স্থগিত করে ‘আদর্শ সংস্কার’ নামে নতুন ধারা তৈরির চেষ্টায় আছে।
বিএনপির মহাসচিব আরও বলেন,
“কয়েকজন ব্যক্তি, একটি গোষ্ঠী বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাবে, আর জনগণ তা বিশ্বাস করবে? জনগণ বিশ্বাস করছে না। শহুরে কতিপয় মানুষই দেশের জনগণ নয়।”
তিনি স্পষ্ট করে দেন, জনগণের সাথে পরামর্শ না করে ‘ঢাকাবিরোধী শহুরে সংস্কার প্রস্তাব’ জনগণ গ্রহণ করবে না।
“নিত্যনতুন এমন সব প্রস্তাব আসছে, যা জনগণের স্বার্থে হলে, জনগণ স্বাগত জানাবে। কিন্তু, জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় কোনো পরিবর্তন তাদেরকে সম্পৃক্ত না করে গ্রহণ করা উচিত হবে না। যারা নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে চায়, তারা গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি নয়, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি নয়।”
এ সময় ফখরুল সকল রাজনৈতিক শক্তিকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, যিনি বলেন,
“প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নিয়ে ঐকমত্য কমিশন বিএনপিকে নিয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছে তা অস্পষ্ট। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের ধারণার সঙ্গে বিএনপি একমত নয়।”
অপর সদস্য নজরুল ইসলাম খান ‘প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন’ বা পিআর পদ্ধতি প্রসঙ্গে বলেন,
“পিআর (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) একটি অস্পষ্ট ধারণা। এটি বাস্তবসম্মত নয়, শুধুই আলোচনার খোরাক।”
মির্জা ফখরুল স্পষ্টভাবে জানান,
“পুলিশ সংস্কার নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনী আসনের সীমানা নির্ধারণে বিএনপি কমিশনের সঙ্গে একমত।”
সংস্কারের নামে বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে দেওয়ার ছক?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চলমান প্রক্রিয়ায় ‘সংস্কার’ শব্দটি দিয়ে যেন নতুন করে ‘সমঝোতার ফাঁদ’ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। একদিকে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ‘ঐকমত্য কমিশন’ বা ‘সাংবিধানিক কাউন্সিল’-এর মতো মডেল এনে নির্বাচনপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার নেপথ্য ইঙ্গিতও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিএনপির বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে—এই মুহূর্তে স্পষ্ট রাজনৈতিক রোডম্যাপ ছাড়া কোনো ‘পরীক্ষামূলক প্রস্তাবনা’ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।