১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদসহ চার শতাধিক এমএনএ ও এমপিএদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মঙ্গলবার (৩ জুন) রাতে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসেলেটিভ ও সংসদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যেখানে এই নেতাদের পরিচয় নতুন করে ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্বদানকারী এ-সকল নেতাদের হঠাৎ ‘সহযোগী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে—এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা। অনেকেই একে দেখছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপসারণ নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ঐতিহাসিক অবমূল্যায়নের অংশ হিসেবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শুধু প্রবাসী সরকারের সদস্যরাই নন, আরও চারটি শ্রেণিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা নয় বরং ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এই চার শ্রেণির মধ্যে রয়েছেন—
১) যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিদেশে থেকে যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন,
২) মুজিবনগর সরকারের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দূতেরা,
৩) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও মুক্তিযুদ্ধপন্থী সাংবাদিকরা,
৪) স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা।
২০১৩ সালে দেওয়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে এসব ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ নতুন এই অধ্যাদেশ সেই স্বীকৃতি সরিয়ে দিয়ে তাদের নতুনভাবে ‘সহযোগী’ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করেছে, যা নিয়ে বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিভিন্ন মহল।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যারা গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যারা সরাসরি যুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই প্রতিনিধিদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মূল্যবোধের ওপর আঘাত।
জানা গেছে, গত ১৫ মে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে এই খসড়া আইন পর্যালোচনার শর্তে অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে অধ্যাদেশটি জারি হয়।
মুক্তিযুদ্ধকালীন মূল নেতৃত্বের এমন মর্যাদাহানিকর শ্রেণিবিন্যাসকে অনেকেই দেখছেন রাজনৈতিক পুনর্লিখনের সূচনা হিসেবে। সরকারি মহলের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না আসলেও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এই সিদ্ধান্ত কাদের স্বার্থে, এবং কেন এই সময়েই এমন অধ্যাদেশ জারি হলো?
এমন এক সময়ে যখন দেশের রাজনীতিতে বিভাজন গভীর, তখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই ধরণের হস্তক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য বিনির্মাণেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমন মত দিচ্ছেন বিশিষ্টজনেরা।