জাতীয় রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে এই দল, যা ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিকেল ৩টায় আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের জমায়েতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক সমাবেশে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করা হবে, যা নতুন ধারার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করবে।
দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে যাদের নাম চূড়ান্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন নাহিদ ইসলাম (আহ্বায়ক) ও আখতার হোসেন (সদস্যসচিব)। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী (প্রধান সমন্বয়কারী), সামান্তা শারমিন (জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক), হাসনাত আবদুল্লাহ (দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক), সারজিস আলম (উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক), আবদুল হান্নান মাসউদ (যুগ্ম সমন্বয়ক) এবং সালেহ উদ্দিন সিফাত (দপ্তর সম্পাদক)। এরা সবাই নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামছেন, যা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন মোড় আনবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি থেকে জানানো হয়েছে, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ হবে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি দল, যা প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য কাজ করবে। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলের, প্রয়োজনে তারা নির্বাচনি জোটেও যেতে পারে।
গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দলটির গঠনপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সদ্য পদত্যাগ করা তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা। বৈঠকে দলের নাম এবং নেতৃত্বের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা আজকের অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
তবে, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন তাসনিম জারা, নাহিদা সারোয়ার নিভা, মনিরা শারমিন ও নুসরাত তাবাসসুম। এছাড়া, আহ্বায়ক কমিটিতে ১৫০ জনেরও বেশি সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যেখানে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সমান সংখ্যক নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গতকাল বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করে। অনুষ্ঠানে দেশের সব রাজনৈতিক দল, কূটনীতিক, সাংবাদিক এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এদিকে, জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এই ঐতিহাসিক সমাবেশের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। গতকাল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে স্টেজ নির্মাণের কাজ চলেছে পুরোদমে, পাশাপাশি ওয়াশরুম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা স্থাপনের কাজও শেষ হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য থাকবে পুলিশের বিশেষ টিম, মেডিক্যাল বুথ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা।
এই নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় নাগরিক কমিটি পুনর্গঠিত হবে। তবে, সংগঠনটি আগের মতোই ‘সিভিল-পলিটিক্যাল’ প্ল্যাটফরম হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। নতুন দল গঠনের সঙ্গে যারা যুক্ত হচ্ছেন, তাদের নাগরিক কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং যারা যুক্ত হচ্ছেন না, তারা আগের মতোই সংগঠনে থাকবেন।
এদিকে, নতুন রাজনৈতিক দলে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা হিসেবে আলোচিত আলী আহসান জোনায়েদ ও জানাকের যুগ্ম সদস্যসচিব রাফে সালমান রিফাত বর্তমানে চীনের সরকারি আমন্ত্রণে সফররত থাকায় আজকের অনুষ্ঠানে তারা থাকছেন না। ইতোমধ্যে তারা ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, তারা নতুন দলে থাকছেন না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং গোটা জাতির জন্য এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা হতে যাচ্ছে। এটি হবে সেই তরুণদের দল, যারা গণঅভ্যুত্থানের সময় সামনের সারিতে থেকে লড়াই করেছে, যারা রাষ্ট্রের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে এবং যারা দেশকে নতুন পথে পরিচালিত করার সাহস রাখে। আজকের সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নতুন গতিপথ দেখাতে পারে।