অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, গুমের শিকার ভুক্তভোগী, যে প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্যাতনের শিকার—তারা কেমন করে এ আইন বাতিলের পরামর্শ দেয়? আমাদের আবেদন, আইনটি যদি পরিশোধিত করতে চায়, তার আগে অনুমোদন দিয়ে আইনে পরিণত করুক, পরে সংশোধিত করা হোক। যদি সেটা না করা হয়, ১২ তারিখ অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেলে, ১৩ তারিখ থেকে গুমের সংজ্ঞা থাকবে না।
রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে এসব কথা বলেন তিনি। পরে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, বিলটি আরও যুগোপযোগী করে চলতি অধিবেশন বা পরে সংসদে উত্থাপন করা হবে।
এর আগে মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে। যেখানে আমার মতো আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি। আমি তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা সেই অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম।
ধরে নিয়েছিলাম এ অন্ধকার ঘরে আমাদের মৃত্যু হচ্ছে। হয়তো আমাদের হত্যা করবে, এখানেই আমাদের মৃত্যু হবে। কথা বলার কেউ ছিল না। কীটপ্রতঙ্গ-পিঁপড়া-টিকটিকির সঙ্গে কথা বলতাম। বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন, নাকি রাত। মনে হতো জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মনে করতাম মৃত্যু হাজারগুণ ভালো। ভাবতাম আজকে রাতে হত্যা করা হবে।
তিনি বলেন, এভাবে মৃত্যুর প্রহর যখন গুনছিলাম, একদিন রাতে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হচ্ছে। তখন ধরে নিচ্ছি আজকেই আমার মৃত্যু হবে। তখন আমি সূরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছিলাম যাতে মৃত্যুটা সহজ হয়।
কিন্তু শুনলাম কিছু বাচ্চা ছেলে জীবন দিয়ে, চোখ-পা হারিয়ে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করে আমাদের আবার দুনিয়ার আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
ব্যারিস্টার আরমান বলেন, এ সংসদকে বলতে হয় মজলুমদের মিলনমেলা। এমন একজনকেও পাবেন না যারা গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। গুমের ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বলছি, আমি স্তম্ভিত হয়েছি। আমাদের সঙ্গে যে জুলুম করা হয়েছিল তা যেন বাংলাদেশের মাটিতে না হয়, সে জন্য গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। বিশেষ কমিটি আইনগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে।
পরে পয়েন্ট অর্ডারে আইনমন্ত্রী বলেন, যারা গুম হয়েছেন, তাদের কেউ আমার স্বজন-ভাই-বোন-আত্মীয়-প্রতিবেশী—বাংলাদেশের মানুষ। তাদের কেউ আমার জিয়া পরিবারের সদস্য।
তিনি বলেন, ওনারা (বিরোধী দল) যেটা নিয়ে হৈ-চৈ করছেন, ওনারা সেটা (আইন) বোধ হয় ভালো করে দেখেননি। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ যেভাবে করা হয়েছে, সেটা (আইনে) করা হলে গুমের শিকার সদস্যদের প্রতি অবিচার করা হবে।
কারণ আমরা একই সঙ্গে আইসিটি অ্যাক্টে গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেখানে বিচার ও তদন্ত হবে। আবার গুম আইনে ভিন্ন একটি তদন্তের কথা বলেছি। সেখানে (আইসিটি অ্যাক্টে) গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু গুমের আইনে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, অধ্যাদেশটি রাখা হলে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষজন অতিরিক্ত হয়রানির শিকার হবেন। যে কারণে আমরা বলেছি, এ দুটি আইন আরও বেশি যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য পরবর্তীতে অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সুনির্দিষ্টভাবে বিল আনবো।
যাতে করে অপরাধীরা কোনোভাবে ছাড়া না পায়। কারণ ব্যারিস্টার আরমান আমার ভাই, স্বজন, সহকর্মী। উনি দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন, সেভাবে বাংলাদেশের সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছিলেন।