রোকুনুজ্জামান, নিজস্ব প্রতিনিধি
জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই যেন এক নতুন পরীক্ষা, যেখানে সময় কখনো আঘাত করে, কখনো শিক্ষা দেয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যারা শত প্রতিকূলতার ভেতর থেকেই খুঁজে নেন নতুন গাঁথুনি, নতুন আলো। তেমনই এক গল্পের নাম জেসমিন। বগুড়ার সারিয়াকান্দীর সেই নদীভাঙা গ্রাম কর্ণিবাড়ী থেকেই শুরু তাঁর যাত্রা। একটি মেয়ে, যার চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, অথচ পায়ের নিচে ছিল কাদামাটির বাস্তবতা। প্রকৃতির নির্মমতা তাঁকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার দিকে, কিন্তু জেসমিন সেই ভাঙনের মাঝেই তৈরি করেছেন নিজের অটুট ভবিষ্যৎ।
নদীর পাড় যখন ভেঙে যাচ্ছিল, তখন হয়তো তাঁর শৈশবও ভেঙে যাচ্ছিল একটু একটু করে। তবু সেই সময়েই মনে জন্ম নেয় এক প্রশ্ন—
“আমিও কি পারি আলোর পথে হাঁটতে?” আজ সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন নিজের জীবনের গল্পে। দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী এখন কেবল এক নাম নয়, এক অনুপ্রেরণা, এক দৃঢ়তার প্রতীক।
জেসমিনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের শুরু মাত্র সাত বছর বয়সে। ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষকরা অবাক হয়ে দেখেন তাঁর শেখার ক্ষমতা। নতুন কিছু জানার কৌতূহল আর দ্রুত বিষয় আয়ত্ত করার দক্ষতায় তিনি খুব অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন সবার প্রিয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরে চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, কুইজ সব ক্ষেত্রেই জেসমিনের উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল।
মাধ্যমিকে ওঠার পর তাঁর প্রতিভা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গণিত ও বিজ্ঞানে অসাধারণ দক্ষতা, যুক্তিতে তীক্ষ্ণতা এবং নেতৃত্বের গুণে তিনি হয়ে ওঠেন সহপাঠীদের অনুপ্রেরণা। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় একের পর এক পুরস্কার অর্জন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে। অষ্টম শ্রেণিতে উপজেলায় প্রথম স্থান পেয়ে মেধাবৃত্তি এবং এসএসসিতে বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান অর্জন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
রাজশাহীর এক নামী কলেজে ভর্তি হওয়ার পর জেসমিনের জ্ঞানপিপাসা পায় নতুন গতি। সহপাঠীরা তাঁকে ভালোবেসে ডাকত
“গুগল প্রো ম্যাক্স” নামে। বিতর্ক, বিজ্ঞান কুইজ, রচনা প্রতিযোগিতা সবখানেই তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে। ২০২২ সালে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে ভর্তি হন দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজে। তাঁর শৈশবের স্বপ্ন তখন বাস্তবে রূপ নেয়। এক শিক্ষক বলেন, “জেসমিন শুধু একজন শিক্ষার্থী নন, সে পুরো এলাকার গর্ব।”
এসব সাফল্য নিয়ে কথা হয় জেসমিনের সাথে। তিনি জানান, “নদীভাঙনে আমাদের ঘর হারালেও আমি বিশ্বাস হারাইনি। আল্লাহর রহমত, পরিবারের দোয়া আর নিজের পরিশ্রমই আমাকে এখানে এনেছে। আমি চাই, আমার মতো মেয়েরা বুঝুক স্বপ্ন সত্যিই পূরণ হয়, যদি মন থেকে বিশ্বাস রাখা যায়।”
আজ জেসমিন শুধু মেডিক্যাল শিক্ষার্থী নন, তিনি আশার প্রতীক। তাঁর গল্প শেখায়, ভাঙন যত গভীরই হোক, যদি মন অটুট থাকে, তবে সেই ভাঙন থেকেই গড়ে ওঠে আলোকিত পথচলা।