বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পরীক্ষামূলক সংস্করণ

জাতীয়

এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে : প্রধান উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না—একই সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।’ আজ মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ […]

এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে : প্রধান উপদেষ্টা

ছবি সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১:০২

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না—একই সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।’ আজ মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন তিনি।

পাঠকদের জন্য প্রধান উপদেষ্টার পুরো ভাষণটি হুবহু দেওয়া হলো :

‘প্রিয় দেশবাসী, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণ—আপনাদের সবাইকে আমার আন্তরিক সালাম ও অভিবাদন।

আসসালামু আলাইকুম। আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎ নির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র এক দিন পরই সারা দেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।

‘আমি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্রতার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদকে, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর আজ আবার গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আপামর জনগণের—বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের—আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন, এই গণভোট—কোনোটিই সম্ভব হতো না। সমগ্র জাতি তাই তাদের কাছে চিরঋণী।’

‘প্রত্যেক জাতির জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যার তাৎপর্য থাকে সুদূরপ্রসারী, যেদিন নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র এবং স্থায়িত্ব ও আগামী প্রজন্মের ভাগ্য।

আগামী পরশু ঠিক তেমনই একটি দিন, যেদিন দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন করব এবং পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করব।

ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাগ করে নেওয়াকে আমি আমার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করেছি।


‘প্রথমেই গভীর সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে, প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সচেতন থেকেছেন।

এই পরিবেশ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি—এটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল। এ জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই দেশের সকল রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যকে। আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি আশাব্যঞ্জক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছি।

তবে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও আমাদের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছায়া রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচার-প্রচারণাকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় আমরা কিছু মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি। এই সহিংসতা আমাদের জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া—কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।’

‘প্রিয় দেশবাসী, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশী। আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রার্থী প্রায় কখনোই দেখা যায়নি।’

‘প্রিয় দেশবাসী, এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে।

তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সাথে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট।

আমি সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই—নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।’

‘প্রিয় দেশবাসী, আজ আমি বিশেষভাবে কথা বলতে চাই আমাদের তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের সঙ্গে। আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেননি। আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল—কিন্তু ভোট ছিল না; ব্যালট ছিল—কিন্তু ভোটার ছিল না।

এই দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও অবদমনের সবচেয়ে বড় মূল্য জাতিকে প্রতিদিন দিতে হয়েছে। তবু আপনারা আশা ছাড়েননি। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। আন্দোলনে, প্রতিবাদে, চিন্তায় ও স্বপ্নে আপনারা একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা লালন করেছেন। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সেই দিনটি এসেছে।’

‘বিশেষ করে আমাদের নারীরা—মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবকটি গণআন্দোলন, পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবখানেই শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নারীরাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। নারীরাই এদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শক্ত ভিত।

ক্ষুদ্র ঋণ, কুটির শিল্প, নারী উদ্যোক্তা এই শব্দগুলোর পেছনে আছে পরিবর্তনের গল্প, পরিবার ও সমাজে সাবলম্বী হবার গল্প। আপনারা ঘরে, রাজপথে সমানভাবে সংগ্রাম করেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ আগলে রেখেছেন, সমাজকে টিকিয়ে রেখেছেন, অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন।

এই নির্বাচন আপনাদের জন্য এক নতুন সূচনা। আর আমাদের তরুণরা—যাদের স্বপ্ন, মেধা ও শক্তিই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি—এই ভোট আপনাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ।’

‘তাই আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি—ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনদিন হারাতে দেবে না।’

‘প্রিয় নাগরিকবৃন্দ, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে,

যাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা যায়। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি তাঁরা সকলেই ঈমান, দেশপ্রেম ও কর্তব্য নিষ্ঠায় উজ্জীবিত হয়ে তাঁদের উপর অর্পিত মহান দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুচারুরুপে পালন করবেন।’

‘প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারাদেশে ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শরীরের সাথে সেঁটে রাখা ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য—ভোটাররা যেন নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে ও সম্মানের সঙ্গে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।’

‘এই নির্বাচনকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন‍্য আমরা কিছু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী আমাদের ভাই-বোনেরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণ করতে পারছেন—এটি আমাদের গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।

আমাদের এই নতুন অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশে প্রচলনের জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এবং আমাদের অভিজ্ঞতার প্রতিটি ধাপ তারা পর্যবেক্ষণ করছে।’

‘একই সঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে—রাষ্ট্র কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়।

ভোটাধিকার কারো দয়া নয়; এটি আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই আমরা ঠিক করি, আমাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।’

‘রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই—আপনারা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দিন, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়।

কেউ যেন সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনভাবে গুজব না-ছড়ায়। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—একটি ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ বা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না।

বরং দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। যারা জনগণের মতামত উপেক্ষা করে শক্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত জনগণের আদালতে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছে।’

‘প্রিয় দেশবাসী, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি—একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা।

আমি আপনাদের অনুরোধ করছি—সতর্ক থাকুন, দায়িত্বশীল থাকুন। যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না। গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা ও সত্য। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।’

‘আপনারা সকল প্রকার অপপ্রচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন— ৩৩৩- এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নিন। এখন নতুন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না।

এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।’

‘প্রিয় দেশবাসী, আমরা একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন থেকে মাত্র কয়েক ঘন্টা দূরে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের এই সুযোগ এনে দিয়েছে। যখন আমরা ভেবেছিলাম আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের জন্য আমাদেরেকে অপেক্ষা করতে হবে আরো পাঁচ বছর, তখনই আমাদের সন্তানরা হুংকার দিয়ে ভেঙে ফেলেছে গোলামির জিঞ্জির। সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে আজকের এই দিনটি আমরা পেয়েছি।’

‘অভ‍্যুত্থানের দিনগুলো এখনো আমাদের স্মৃতিতে টাটকা। দেয়ালের লিখনগুলো এখনো সারাদেশের দেয়ালে দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে। দেয়ালে দেয়ালে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতির মাধ‍্যমে লিখেছিল তাদের মনের কথাগুলো। সেখানে তারা বলেছে পরিবর্তনের কথা, সংস্কারের কথা।’

‘জুলাই সনদ কোনো দলের একক ইশতেহার নয়। দীর্ঘ নয় মাস ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ প্রস্তুত করেছে। এই আলোচনায় অনেক প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে দীর্ঘ মতবিনিময় শেষে রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করেছে।

এই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার এক ঐতিহাসিক দলিল, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। এই সনদের মাধ্যমে আমরা সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছি।

তবে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সমাজে সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ—এসবের সফল বাস্তবায়ন এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়।’

‘এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত। কারণ একটি জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক সিদ্ধান্তে বা একক শাসনের মাধ্যমে টেকসই হয় না। জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকেই।

তাই দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক পথের মূল ভিত্তি। এই লক্ষ্যেই আমরা গণভোটের আয়োজন করেছি—যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংস্কার-দিশা নির্ধারণে জনগণ সরাসরি নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন। এই গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখানে আপনার প্রতিটি ভোট আগামী দিনের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে।’

‘এর প্রভাব থাকবে বহু প্রজন্মজুড়ে। এই ভোটের মাধ্যমেই আপনারা জানি জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামোকে এগিয়ে নিতে চান কি না। আপনাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র কোন পথে অগ্রসর হবে, শাসনব্যবস্থা কোন কাঠামোয় গড়ে উঠবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশ কীভাবে তার গণতান্ত্রিক ও মানবিক রূপ লাভ করবে।’

‘এই গণভোটে আপনার একটি ভোট শুধু একটি কাগজে দেওয়া সিল নয়—এটি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, আপনার পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

আজ আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রভাব পড়বে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে। এটি এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব ও অধিকার এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে।’

‘আমি তাই আপনাদের সবাইকে এই গণভোটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার জন‍্য আহ্বান জানাচ্ছি। অবশ্যই ভোট দিন। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নিশ্চিত করুন। আসুন, আমরা সবাই মিলে দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে সফল করে তুলি। ভয় নয়—আশা নিয়ে; উদাসীনতা নয়—দায়িত্ববোধ নিয়ে; বিভক্তি নয়—ঐক্যের শক্তি নিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য গণভোটের মাধ্যমেই আমরা প্রমাণ করব—বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে জানে। আপনার ভোটেই রচিত হবে গৌরবময় আগামীর বাংলাদেশের ইতিহাস।’

‘প্রিয় দেশবাসী, নির্বাচন হয়ে গেলে নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তার সঙ্গে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবং গৌরবের সঙ্গে নব-নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাদের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাবো। আমরা এই শুভ মহুর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’

‘প্রিয় দেশবাসী, আপনারা দলে দলে সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। এবারের ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন।’

‘প্রিয় দেশবাসী, আসুন উৎসবমুখর নির্বাচন বাস্তবে রূপায়িত করে এই দিনটিকে ইতিহাসের স্মরণীয় দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রাখি। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।’

জাতীয়

হাদি হ/ত্যা/য় জড়িত প্রত্যেকের নাম উন্মোচন করে দেবো : ডিএমপি কমিশনার

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন শেখ মো. সাজ্জাত আলী। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে তিনি এ কথা বলেন। ডিএমপি কমিশনার বলেন, এই হত্যাকাণ্ড একটি রহস্যজনক ঘটনা এবং এর পেছনে একাধিক ব্যক্তি জড়িত […]

হাদি হ/ত্যা/য় জড়িত প্রত্যেকের নাম উন্মোচন করে দেবো : ডিএমপি কমিশনার

ছবি সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৩৬

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন শেখ মো. সাজ্জাত আলী।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, এই হত্যাকাণ্ড একটি রহস্যজনক ঘটনা এবং এর পেছনে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা রয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের পরিচয় জনসম্মুখে আনা হবে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, হাদিকে গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত দুটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্রগুলো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য সিআইডি-তে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ডিবি পুলিশ উদ্ধার করেছে।

হত্যাকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার জানান, তদন্তে ২১৮ কোটি টাকার সই করা একটি চেক উদ্ধার করা হয়েছে, যা ঘটনার অর্থনৈতিক যোগসূত্র বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

তিনি বলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ৭ জানুয়ারির মধ্যেই এ মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।

এ সময় তথ্য ও সম্প্রচার; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

হাদির হত্যার বিচার দাবিতে শনিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো শাহবাগে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ। এর আগে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) জুমার নামাজের পর ইনকিলাব মঞ্চ ও জুলাই মঞ্চের নেতাকর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থান নেন। অবস্থান কর্মসূচি শুরু হলে এতে সমাজের নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়।

জাতীয়

বেরিয়ে এলো ওসমান হাদি হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার মাস্টারমাইন্ডের নাম সামনে এসেছে। হত্যার নেপথ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ ওরফে ‘শাহীন চেয়ারম্যান’র নাম উঠে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কিলিং মিশন বাস্তবায়নে অর্থ এবং অস্ত্রের জোগানদাতা ছিলেন তিনি নিজেই। এছাড়া চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে শাহীন চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসাবে আরও কয়েকজনের যোগসূত্রতা […]

বেরিয়ে এলো ওসমান হাদি হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য

বেরিয়ে এলো ওসমান হাদি হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিউজ ডেস্ক

২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০৭

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার মাস্টারমাইন্ডের নাম সামনে এসেছে। হত্যার নেপথ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ ওরফে ‘শাহীন চেয়ারম্যান’র নাম উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কিলিং মিশন বাস্তবায়নে অর্থ এবং অস্ত্রের জোগানদাতা ছিলেন তিনি নিজেই। এছাড়া চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে শাহীন চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসাবে আরও কয়েকজনের যোগসূত্রতা জানতে পেরেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। যাদের কয়েকজন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা। এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল একটি সূত্র।

সূত্র জানায়, শাহীন চেয়ারম্যান ছাড়াও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল হামিদকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হাদির ওপর হামলার পর ঘাতকদের ঢাকা থেকে সীমান্ত পর্যন্ত পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন এই হামিদ। জুলাই বিপ্লবে শরিফ ওসমান হাদির ভূমিকা এবং গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে তার বিভিন্ন বক্তব্য ও সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ চরম ক্ষুব্ধ ছিল। দলটি হাদিকে আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসরদের জন্য বড় বিপদ হিসাবে চিহ্নিত করে। এরপর হিটলিস্টের প্রথম টার্গেট হিসাবে হাদিকে হত্যার ছক কষা হয়।

জানা যায়, শাহীন আহমেদ দীর্ঘদিন ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তবে তিনি মাফিয়া ডন হিসাবেই বেশি পরিচিত। শেখ হাসিনা আমলে তিনি ছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ডানহাত। চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং অস্ত্রধারী হিসাবে তার নাম পুলিশের খাতায় অনেক আগে থেকে তালিকাভুক্ত ছিল। বহুবিধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বরং প্রশাসন তাকে সমীহ করে চলত। এসব প্রভাব প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে তিনি একাধিকবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

স্থানীয়রা জানান, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকের মতো শাহীন চেয়ারম্যানও সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যেতে সক্ষম হন। সেখানে পলাতক অবস্থায় তিনি দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকলেও গত ৩-৪ মাস থেকে খোলস ছেড়ে পুরোনো চেহারায় আবির্ভূত হন। সম্প্রতি তিনি দেশের মধ্যে আওয়ামী লীগের হিটলিস্ট প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন অ্যাপসে মুঠোফোনে দেশে থাকা স্লিপার সেলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি হোয়াটসঅ্যাপ কল এবং খুদেবার্তার (এসএমএস) সূত্রে হাদি হত্যায় শাহীন চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ঘটনার আগে ও পরে কিলারদের সঙ্গে পলাতক ছাত্রলীগ নেতা হামিদের একাধিকবার যোগাযোগ করার প্রমাণও মিলেছে। এছাড়া ভারতে পলাতক থাকা আরও কয়েকটি গ্রুপ অ্যাপস ব্যবহার করে ঢাকায় জড়ো স্লিপার সেলের সদস্যদের কাজ সমন্বয় করছে। যাদের অনেকে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যে চলে এসেছে। কানের ডাক্তার তাহের পপুলার

সূত্র বলছে, হাদি হত্যা মামলার তদন্তে সন্দেহভাজনের তালিকায় কয়েকজন রাজনীতিকের নামও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আরও তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এজন্য গ্রেফতারকৃত আসামিদের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থার টিমসহ যৌথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া পলাতক শাহীন চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত কেরানীগঞ্জ জেলার দুজন ছাত্রলীগ নেতাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম শুক্রবার রাতে বলেন, ‘আমরা সবদিক মাথায় রেখে তদন্ত করছি। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করি খুব শিগগিরই এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ডসহ পরিকল্পনাকারীদের সবার নামই জানা সম্ভব হবে।’

জাতীয়

ফয়সালের জামিনে যুক্ত ছিলো বড় রাজনৈতিক দলের নেতার প্রভাবশালী আইনজীবীরা : আইন উপদেষ্টা

ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জড়িত ফয়সাল করিম মাসুদ ইতিপূর্বে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্ত হওয়ার বিষয়ে মুখ খুলেছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাত ১১টা ২৭ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। আইন উপদেষ্টা ড. […]

নিউজ ডেস্ক

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৪৮

ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জড়িত ফয়সাল করিম মাসুদ ইতিপূর্বে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্ত হওয়ার বিষয়ে মুখ খুলেছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।

বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাত ১১টা ২৭ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন।

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ‘জামিন বিতর্ক’ শীর্ষক ফেসবুক স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো—

আমাদের প্রিয় ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ করেছে ফয়সাল করিম মাসুদ নামের এক ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী। তাকে র‍্যাব গ্রেপ্তার করেছিল গত বছর। এরপর তার জামিন হয়েছে হাইকোর্ট থেকে। এই প্রসঙ্গে, জামিন দেওয়ার ন্যয্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আবারও আলোচনা-বিতর্ক উঠছে।

প্রথমেই বলে রাখি, হাইকোর্ট বিচারিক কাজে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। হাইকোর্টের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ পৃথিবীর কোনো দেশে থাকে না, বাংলাদেশেও নেই। কাজেই সেখানে ফয়সাল করিম মাসুদের জামিন হওয়ার সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

ফয়সাল করিম মাসুদ গত বছর জামিন পেয়েছিল অস্ত্র মামলায়। হাইকোর্টে অস্ত্র মামলার জামিন সহজে হওয়ার কথা নয়। এটি তখনই হতে পারে যখন প্রভাবশালী আইনজীবীরা এসব মামলায় জামিন দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। এই আইনজীবীরা অধিকাংশই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রভাবে এসব জামিন হওয়া সহজতর হয়।

হাইকোর্টের প্রদত্ত জামিনে বিচারিক বিবেচনা কতটা থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকে। যেমন : হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে কীভাবে চার ঘণ্টায় ৮০০ মামলায় জামিন হয়েছিল, তা নিয়ে আমি কয়েক মাস আগে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলাম (২৩ অক্টোবর, ২০২৫)। এজন্য এক শ্রেণীর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আমার পদত্যাগ পর্যন্ত দাবি করা হয়েছিল (২৫ অক্টোবর ২০২৫)।

২. জামিন পাওয়ার সুযোগ আমাদের আইনে রয়েছে। কিন্তু গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যে অপরাধীর সংযোগ অত্যন্ত স্পষ্ট, যে অপরাধী চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং যে ব্যক্তি জামিন পেলে পুনরায় অপরাধ করতে পারে বা অন্য কারও জীবন বিপন্ন করতে পারে, তাকে জামিন দেওয়া অস্বাভাবিক ও অসঙ্গত। এ নিয়ে আমি প্রকাশ্যে বলেছি। মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় উনার কাছে উচ্চ আদালতে অস্বাভাবিক জামিন নিয়ে আমার উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলাম।

কিছু জামিন নিম্ন আদালত থেকেও হয়েছে গত ১৬ মাসে। আমরা সেসব মামলার কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মামলায় আসামি কীভাবে অপরাধটিতে জড়িত, পুলিশ তার কোনো তথ্য অভিযোগপত্রে দেয়নি, এমনকি আসামির দলীয় পরিচয় পর্যন্তও মামলার কোনো কাগজে উল্লেখ করেনি। এরপরও আমি যথাযথ বিচারিক বিবেচনা না করে যেনতেনভাবে জামিন না প্রদান করার কথা বলেছি (১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)। কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে।

৩. জামিন বাণিজ্যে যারা লিপ্ত আছেন, তাদেরকে বলছি—এবার থামুন। আমাদের ছেলেদের জীবন বিপন্ন করার মতো সিদ্ধান্ত দেবেন না। এক গণহত্যাকারী পাশের দেশে বসে আমাদের জুলাই বীরদের হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে। বিচারিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে জামিন দিয়ে সেই গণহত্যাকারীর অনুসারীদের এই সুযোগ করে দেবেন না। না হলে, পরকালেও এর দায় আপনাদের নিতে হবে।